সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ কফি দিয়ে দিন শুরুর অভ্যাস রাজধানীর কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা আবিদা সুলতানার। তার দীর্ঘদিনের সেই অভ্যাসেও ছেদ পড়ে। বাসার চুলায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাকে তিনবেলা রান্নাও করতে হতো বৈদ্যুতিক চুলায়। কখনো কখনো রান্নার ঝামেলা এড়াতে খাবার কিনে আনতে হতো বাইরে থেকে।
তবে আজকের সকালটা ছিল অন্যরকম। গ্যাসের চাপ ছিল স্বাভাবিক। রান্নাঘরের গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বলেছে। পাঁচ সদস্যের পরিবারের সকালের রান্না হয়েছে ঝামেলা ছাড়াই।
শুধু আবিদা সুলতানা নন, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে ভুগতে থাকা রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও আজ এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময়ে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পর গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখ্যযোগ্য হারে বেড়েছে। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি শেষে শিল্পের পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ বেড়েছে। গতকাল রাত থেকেই চাপ বাড়তে শুরু করায় নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনেও ফিরতে শুরু করেছে স্বাভাবিকতার ছন্দ।
রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট। কয়েক দিন আগেও যেখানে গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে, আজ সেখানে নেই দীর্ঘ সারি। স্টেশনে ঢোকার পর অপেক্ষার সময়ও কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
যাত্রাবাড়ীর উত্তর কুতুবখালীর ক্যাব এক্সপ্রেস (বিডি) লিমিটেডে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস নেওয়ার জন্য হাতেগোনা কয়েকটি সিএনজি, লেগুনা ও মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছে। স্টেশনের কর্মচারীরা জানান, গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ গ্যাসের চাপ অনেকটাই বেড়েছে। ফলে যানবাহনগুলোকে আগের মতো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে না।
এই প্রতিবেদকের উপস্থিতিতে একটি সিএনজিতে ২০০ টাকার গ্যাস নিতে সময় লাগে মাত্র ৭ মিনিট। এসময় সিএনজি চালক বাচ্চু সিকদার বাসস-কে বলেন, ‘দুই দিন আগেও ২০০ টাকার গ্যাস নিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগতো। তার আগে আবার লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো ২ থেকে ৩ ঘণ্টা। আজ সিরিয়ালসহ মোট ৪০ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস নিতে পেরেছি।’
ক্যাব এক্সপ্রেস (বিডি) লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. এমদাদুল হক বলেন, গ্যাসের চাপ সন্তোষজনকভাবে বেড়েছে। ফলে, ফিলিং স্টেশনে এখন আর আগের মতো যানবাহনের দীর্ঘ সারি নেই।
তিনি বলেন, ‘কমপ্রেস করার পর গ্যাসের চাপ এখন ২০০-এর কাছাকাছি। দুই দিন আগেও যা ছিল ১৩০ থেকে ১৩৫-এর মতো।’
লেগুনা চালক মো. রনির অভিজ্ঞতাও একই। তিনি বলেন, ‘আজ ২ হাজার ৫০০ টাকার গ্যাস নিয়েছি। এতে সারাদিন গাড়ি চালাতে পারব। কয়েকদিন আগেও গ্যাস নেওয়ার তাড়া ছিল। তাই আগেভাগেই এসে সিরিয়াল দিতে হতো। এখন আর সেই ঝামেলা নেই।’
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) সরবরাহ করা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা, বাসাবাড়ি ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজধানীর মানিকনগরের বেস্ট ইস্টার্ণ সিএনজি ফিলিং স্টেশন, বকশীবাজারের সোনারবাংলা সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং গাবতলীর যমুনা সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি স্টেশন ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মঙ্গলবার রাত থেকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। আজ তা আরো বেড়েছে। ফলে, যানবাহনগুলোতে চাহিদা মতো গ্যাস দেওয়া হচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, বুধবার বিকেল পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৬১ কোটি ঘনফুট। যার অধিকাংশই ছিল দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহকৃত গ্যাস।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় গ্রিডে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের পাশাপাশি এলএনজি আমদানি অব্যাহত রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ফারহান নূর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর গতকাল রাত থেকেই গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নতুন লাইনগুলোতে গ্যাসের চাপ পুরোনো লাইনের তুলনায় বেশি।
তিনি বলেন, ‘কমপ্রেস করার পর গ্যাসের চাপ এখন ২০০-এর কাছাকাছি। ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের চাপ কমেছে। আমরা আশা করছি, পুরোনো লাইনগুলোতেও ধীরে ধীরে চাপ বাড়বে। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, গ্যাসের চাপ যেন এই পর্যায়ে বজায় থাকে।’
গ্যাসের চাপ বাড়ার বিষয়টি শুধু সিএনজি স্টেশনেই নয়, স্বস্তি ফিরিয়েছে বাসাবাড়িতেও। মানিকনগরের রিকশাচালক সৌরভ দে জানান, চার সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি সেখানে থাকেন। বাসায় গ্যাস না থাকায় এতদিন সকালে না খেয়েই রিকশা নিয়ে বের হতে হতো।
তিনি আরো বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর আজ সকালে বাসা থেকে নাশতা খেয়ে বের হয়েছি। কয়েকদিন আগেও গ্যাস না থাকায় পরিবারের চার সদস্যের জন্য তিনবেলার খাবার হোটেল থেকে কিনে আনতে হতো। এখন আর সেই প্রয়োজন হচ্ছে না।’
আবিদা সুলতানাও দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক থাকার কথা জানান। বিকেল ৩টার দিকে মোবাইলে তিনি বাসস-কে বলেন, গ্যাসের চাপ তখনও অব্যাহত। দুপুরের রান্নাও গ্যাসের চুলায় করেছেন তিনি। গ্যাসের চাপ বাড়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
ফারহান নূর বলেন, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। এজন্য দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে দেশীয় উৎপাদনকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি খাতকে আমদানিনির্ভর করা হয়েছিল। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে আমাদের এখন চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।’
তিনি বর্তমান সরকারকে ধীরে ধীরে এলএনজি আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানান। সূত্র: বাসস
জেবি




