দেশের সব মাদরাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সেল এবং প্রতিটি মাদরাসায় ‘শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা কমিটি’ গঠনের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ নূরুল হুদা স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, আইন, সমাজকল্যাণ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবদের এই নোটিশ পাঠিয়েছেন।
নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে হাই কোর্টে রিট করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নোটিশ পাঠানোর বিষয়ে আইনজীবী নূরুল হুদা বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতন, বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো ঘটনার বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যই এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, নোটিশে মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—একটি হলো প্রতিটি মাদরাসায় শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা কমিটি গঠন, অন্যটি জাতীয় পর্যায়ে সেল প্রতিষ্ঠা। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএনডব্লিউএলএ) বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য মামলায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তার আলোকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাদরাসায় এ ধরনের কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
নোটিশে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের ওই রিট মামলার রায় দেওয়া হয় ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি। মাদরাসায় শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে ওই মামলার নির্দেশনার আদলেই কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে নোটিশে বলা হয়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিশু যৌন নির্যাতনের ৩৯টি প্রতিবেদিত ঘটনার মধ্যে ২৩টি বা ৫৯ শতাংশই ঘটেছে মাদরাসায়। অথচ মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে মাদরাসা শিক্ষার্থীর অনুপাত মাত্র প্রায় ১৬ শতাংশ। মাদরাসা শিক্ষার্থী আনুমানিক ২৭ লাখ ৬০ হাজার এবং স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ১৭ মার্চ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ছয় মাসেরও কম সময়ে দেশের অন্তত ১৮টি জেলায় মাদরাসার শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও তত্ত্বাবধায়কদের বিরুদ্ধে শিশুদের ধর্ষণ, বলাৎকার, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও গুরুতর শারীরিক নিষ্ঠুরতার অন্তত ৩০টি পৃথক ঘটনার তথ্য জাতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করার কথা নোটিশে বলা হয়েছে।
এসব ঘটনায় পাঁচ, ছয় ও সাত বছর বয়সী শিশুরাও ভুক্তভোগী হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় মাস বা প্রায় এক বছর ধরে নির্যাতন চললেও তা প্রকাশ্যে আসেনি বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভয়াবহ চিত্র ও কাঠামোগত দুর্বলতা
এ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ঢাকার রায়েরবাগে ১৩ বছর বয়সী নাঈম শেখ এবং ঢাকার বনশ্রীতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পর আত্মহত্যা করা ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে নোটিশে।
নেত্রকোণার মদনে ১১ বছর বয়সী এক শিশু মাদরাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের পর গর্ভবতী হওয়ার এবং পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টিরও উল্লেখ রয়েছে সেখানে।
এ ছাড়া দিনাজপুরের বিরামপুরে গত ৫ সেপ্টেম্বরের একটি মামলায় এক শিক্ষক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বিভিন্ন মাদরাসায় আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করার কথা স্বীকার করেছেন বলেও নোটিশে তুলে ধরা হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, আলিয়া মাদরাসা ব্যবস্থা সরকারি শিক্ষা তত্ত্বাবধানের অধীনে থাকলেও হিফজ ও কওমি মাদরাসার বড় একটি অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একই সঙ্গে মাদরাসা শিক্ষকদের জন্য কেন্দ্রীয় ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন বা ‘কালো তালিকার’ ব্যবস্থা না থাকায় শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে অবাধে অন্য মাদরাসায় যোগ দিতে বা নতুন মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন।
নোটিশের দাবি ও করণীয়
সেল ও কমিটি গঠনের পাশাপাশি নোটিশে শিশু আইন, ২০১৩-এর অধীনে গঠিত জাতীয়, জেলা ও উপজেলা শিশুকল্যাণ বোর্ডগুলোকে তাদের আওতাধীন প্রতিটি মাদরাসার শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।
প্রতিটি মাদরাসায় লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, স্বাধীন ও গোপনীয় অভিযোগ ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য জাতীয় শিশু-সুরক্ষা হটলাইন এবং জেলা শিশু-সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করার দাবিও রয়েছে সেখানে।
এ ছাড়া শিক্ষক, আবাসিক তত্ত্বাবধায়ক, হোস্টেল ওয়ার্ডেন ও কেয়ারটেকার নিয়োগের আগে এবং চাকরিকালে পুলিশ ভেরিফিকেশন, ফৌজদারি রেকর্ড ও পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করা, আবাসিক মাদরাসায় নিয়মিত ও পূর্বঘোষণাবিহীন স্বাধীন সরকারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা এবং ধর্ষণ, বলাৎকার বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তকে শিশুদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দূরে রাখার দাবি করা হয়েছে।
নোটিশে প্রতিটি মাদরাসার প্রবেশপথ, করিডোর, শ্রেণিকক্ষ ও সাধারণ আবাসিক এলাকায় সিসিটিভি স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। তবে বাথরুম, টয়লেট বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত স্থানে ক্যামেরা স্থাপন নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছে।
এসব দাবির পক্ষে বাংলাদেশের সংবিধানে থাকা শিশুদের মৌলিক অধিকার এবং শিশু আইন, ২০১৩ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের কথা নোটিশে উল্লেখ করেছেন এই আইনজীবী।
আরএনবি/এআর




