রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা নিউ মার্কেটে ফুটপাত দখল করে বসা হকারদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। ফুটপাত ছাড়িয়ে মিরপুর রোডের কিনারা পর্যন্ত পণ্যের পসরা নিয়ে বসছেন তারা। এতে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জনজট ও যান চলাচলে বিশৃঙ্খলা।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিউ মার্কেটের মিরপুর রোডসংলগ্ন এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। কাপড়, শিশুদের পোশাক, ব্যাগ, জুতা, খেলনা, প্রসাধনী, চুলের সামগ্রীসহ নানা ধরনের পণ্য নিয়ে বসেছেন হকাররা। অনেক দোকানে পণ্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে ফুটপাতের সীমানা ছাড়িয়ে রাস্তার কাছাকাছি পর্যন্ত। ফলে পথচারীদের জন্য অবশিষ্ট জায়গা সংকুচিত হয়ে এসেছে।
ফুটপাতের ওপর একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক হকারের দোকান বসেছে। এসব দোকান ঘিরে ক্রেতাদের ভিড়ও রয়েছে। কোথাও দোকানের সামনে ক্রেতারা দাঁড়িয়ে পণ্য দেখছেন, আবার কোথাও পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল করে চলছে কেনাকাটা। ফলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার সুযোগও অনেকাংশে কমে গেছে।

নিউ মার্কেট এলাকায় শুধু ফুটপাত নয়, হকারদের পসরা ধীরে ধীরে মূল সড়কের পাশেও ছড়িয়ে পড়েছে। মিরপুর রোডের মতো ব্যস্ত সড়কের পাশে এভাবে পণ্য নিয়ে বসায় একদিকে যেমন পথচারীদের রাস্তার দিকে নেমে চলতে হচ্ছে, অন্যদিকে যানবাহনের সঙ্গে পথচারীদের সংঘর্ষের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা না থাকায় অনেক পথচারী বাধ্য হয়ে সড়কের প্রান্ত দিয়ে চলাচল করেন। এ সময় বাস, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চাপ থাকায় তৈরি হয় বাড়তি ঝুঁকি।
হকারদের পসরা শুধু চলাচলের জায়গাই সংকুচিত করছে না, নিউ মার্কেট এলাকার সামগ্রিক পরিবেশেও বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। বাঁশ, ত্রিপল, দড়ি ও বিভিন্ন অস্থায়ী কাঠামো দিয়ে তৈরি দোকানগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। কোথাও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে পোশাক, কোথাও মাটির ওপর সাজানো হয়েছে ছোটখাটো পণ্য। ফলে পুরো ফুটপাত পরিণত হয়েছে অস্থায়ী বাজারে।
এদিকে ফুটপাত দখলের কারণে নিয়মিত দোকান ও মার্কেটের ভেতরের ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থায়ী ব্যবসায়ীদের অনেকেই মনে করেন, ফুটপাতের হকারদের কারণে নিউ মার্কেটের সামনের অংশে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। ক্রেতাদের একটি অংশ ফুটপাতের দোকানেই কেনাকাটা করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অসন্তোষ।
নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী আফজাল করিম বলেন, 'আমরা দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীর বেতনসহ নানা খরচ দিয়ে ব্যবসা করি। কিন্তু দোকানের সামনেই ফুটপাতজুড়ে হকার বসে যাওয়ায় ক্রেতাদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে আমাদের ব্যবসার ওপরও প্রভাব পড়ছে।'
আরেক ব্যবসায়ী ফোরকান বলেন, 'হকার থাকবেন, তাদেরও জীবিকা আছে—এটা আমরা বুঝি। কিন্তু ফুটপাতের পুরোটা দখল করে ব্যবসা করলে পথচারীরা চলবে কোথা দিয়ে? প্রশাসনের উচিত নির্দিষ্ট জায়গা করে দেওয়া। আগে ফুটপাত দিয়ে মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারত। এখন দোকানের পণ্য আর হকারদের বসার কারণে মানুষকে রাস্তায় নেমে হাঁটতে হচ্ছে।'
তবে হকারদের ভাষ্য, ফুটপাতে ব্যবসা করেই তাদের জীবিকা চলে। অনেকের দাবি, স্থায়ী দোকান নেওয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। ফুটপাত ছেড়ে দিলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে। তাই উচ্ছেদ না করে নির্দিষ্ট জায়গায় তাদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তারা।
কসমেটিক্স বিক্রেতা এক হকার বলেন, 'আমরা গরিব মানুষ। এই ফুটপাতেই ব্যবসা করে সংসার চালাই। দোকান ভাড়া নেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। হঠাৎ উচ্ছেদ করলে আমাদের পরিবার না খেয়ে থাকবে। আমরাও চাই মানুষ চলাচলের জন্য জায়গা থাকুক। কিন্তু আমাদের ব্যবসা করার জন্য যদি নির্দিষ্ট জায়গা দেওয়া হয়, তাহলে আমরা সেখানে চলে যাব।'

কাপড় ব্যবসায়ী এক হকার বলেন, 'প্রতিদিন এখানে বসার পর কত টাকা বিক্রি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারপরও বাধ্য হয়ে বসতে হয়। অন্য কোনো কাজ বা ব্যবসার সুযোগ থাকলে আমরাও ফুটপাতে বসতে চাইতাম না। অভিযান হলে আমাদের পণ্য সরিয়ে নিতে হয়, আবার পরে বসি। এভাবে আমাদেরও ক্ষতি হয়। সরকার যদি স্থায়ীভাবে কোনো ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে আমরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাই।'
নিউ মার্কেট এলাকায় হকারের সংখ্যা এবং তাদের দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে ফুটপাত খালি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কিছুদিন পর আবারও একই জায়গায় দোকান বসতে দেখা যায়। ফলে স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ফুটপাত দখলের সমস্যা বারবার ফিরে আসছে।
নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় নিউ মার্কেটে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসা-যাওয়া করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচল। এমন ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগের মাত্রাও বাড়ছে।
পথচারী আকাশ কুমার বলেন, 'নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করতে এসে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ পাওয়া যায় না। এক দোকান থেকে আরেক দোকান, মাঝখানে ক্রেতার ভিড়—সব মিলিয়ে হাঁটা খুব কষ্টকর। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আমাদের মূল সড়কের পাশে দিয়ে হাঁটতে হয়। বাস-রিকশা খুব কাছ দিয়ে চলে যায়। একটু অসতর্ক হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। হকাররা যদি নির্দিষ্ট জায়গায় বসেন, তাহলে কারও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ফুটপাতের পাশাপাশি রাস্তার কিনারাও দখল হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। শুধু হকার উচ্ছেদ করলেই সমাধান হবে না। উচ্ছেদের কয়েকদিন পর আবার একই জায়গায় দোকান বসে। স্থায়ীভাবে ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।'
স্থানীয়দের মতে, হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পথচারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন হাঁটার জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। ফুটপাতের নির্দিষ্ট অংশে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হলে একদিকে হকারদের জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে পথচারীদের চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত করা যাবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবা খান বলেন, 'হকার উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে উচ্ছেদের পর আবারও হকাররা ফুটপাত দখল করে বসছেন। বিষয়টি শুধু উচ্ছেদ করে সমাধান করা সম্ভব নয়। হকারদের নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ চলছে। এ বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করছে।'
নগর পরিকল্পনাবিদ, শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, মিরপুর রোডের ফুটপাত দখল করে হকাররা রাস্তায় নেমে আসায় পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত শোচনীয়। সরকার অবৈধ দখল উচ্ছেদে উদ্যোগ নিলেও পরবর্তী সময়ে তা কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে পারছে না। ফলে উচ্ছেদ অভিযান ও দখলমুক্ত করার উদ্যোগের পরিবর্তে আরও বেশি সংখ্যক হকারকে রাস্তায় নামার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের এই ব্যবস্থাপনার কারণে হকারদের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঁদাবাজিও বেড়েছে। চাঁদাবাজির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের অনেকের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। সরকার বারবার হকার উচ্ছেদের কথা বললেও বাস্তবে এই চক্র নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, যারা ফুটপাত ও সড়ক ব্যবহারের অধিকার রাখেন, তাদের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। দরিদ্র মানুষকে রাস্তায় রেখে পুনর্বাসনের চিন্তা করা হলে তা ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার জন্য সুফল বয়ে আনবে না। বরং সামাজিক নিরাপত্তা বাড়িয়ে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
এম/এআর




