বাংলাদেশে অনলাইন রাজনৈতিক পরিসরে মতবিরোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়, যেখানে নারীরাও হয়রানি ও অশ্লীলতার লক্ষ্যবস্তু হন। সম্প্রতি শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটি মিমকে ঘিরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আসাদুল্লাহ আতিকের স্ত্রীকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ছবি তৈরির অপচেষ্টা করা হয়েছে। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আর বাড়েনি, ঘটনাটি অনলাইনে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার সুযোগে নারীদের ডিজিটাল হয়রানির ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।
এই মুহূর্তে আশির দশকের ফটো ট্রেন্ডে মাতোয়ারা নেটিজেনরা। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা তাদের ছবি গুগলের জেমিনি এআই বা চ্যাটজিপিটিতে আপলোড করে আশি বা কাছাকাছি দশকের আদলে নতুন রূপ দিচ্ছেন। এই ট্রেন্ড অনুসরণ করে ৯ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর আসাদুল্লাহ আতিক তার ‘আতিক ভাই’ নামের পেজ থেকে। পোস্টটিতে ‘বেকার খাটনি’ ক্যাপশন দিয়ে শেখ হাসিনার মুখ ব্যবহার করে ছবির ওপর লেখা হয়, ‘যখন দেখেন, এত কষ্ট করে ডিজিটাল করার পর সবাই আবার 80’s এ ফিরে গেছে।’

এই পোস্টের পরপরই পোস্টটির কমেন্টে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সমালোচনা, গালাগাল ও অশ্লীল বার্তার ঢল নামে। এটিকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার হিসেবে দাবি করে আওয়ামীপন্থী গ্রুপ ‘ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশ’-এর অ্যাডমিন Aronno Abir-এর প্রোফাইল থেকেও পোস্ট করা হয়। সেখানে আতিকের স্ত্রীর ছবি ব্যবহার করে আপত্তিকর এডিট করার আহ্বান জানানো হয় এবং তার স্ত্রীর ফেসবুক আইডির লিংক কমেন্টে দেওয়ার কথাও বলা হয়। কিছুক্ষণ পর একই প্রোফাইল থেকে আবারও তার স্ত্রীর ছবি নিয়ে আপত্তিকর এডিট করে কমেন্টে পোস্ট করার আহ্বান জানানো হয়।

অতি উৎসাহী একটি প্রোফাইল থেকে শুরুও হয় ডিজিটাল প্রযুক্তিতে এডিট করা আপত্তিকর ছবি কমেন্ট করা।

পরের ঘটনা কী হতো? মুহূর্তেই বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে এমন সব আপত্তিকর ছবি ছড়াতে শুরু করতো। বাংলাদেশে অনলাইনে রাজনৈতিক বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি প্রচারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা বলছে, এর পরের ঘটনাপ্রবাহ অনুমান করা কঠিন ছিল না। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ভিন্ন কিছু।
এসব ঘটনার মধ্যেই আতিক তার পেজের পোস্টটির কমেন্টের ঘরে লিখেন, ‘ছাত্রলীগের চ্যালাচামুন্ডা গুলা এই ব্রেন নিয়ে রাজনীতি করে এ কারণেই সারাজীবন নেতার পা চেটে যায়, বড় হতে পারে না। শেখ হাসিনার ছবি দেখেই ভাবছে অপমান করছি, গালিগালাজ শুরু করে দিছে। আরে ব্যাটা, উনি যে দেশ ডিজিটাল করছে, কিন্তু মানুষ ৮০ তে ফিরে গেছে সেটা বুঝাইছি। প্রশংসা করছি। গালি তো দেওয়ার কথা ছাত্রদলের।’
একই সঙ্গে Aronno Abir-এর পোস্টের কমেন্টেও আওয়ামীপন্থী কয়েকজন বিষয়টিকে ‘নেতিবাচক হিসেবে না দেখার’ আহ্বান জানান। Adv Omit Rosul Opi নামে একজন লেখেন, ‘এটা তো এপ্রিশিয়েট করা উচিত, কি ব্রেন রে ভাই আমাদের।’
অন্যদিকে রুবেল আহমেদ নামে একজনের মন্তব্য, ‘অযথা কাজ করার মানে নাই। এখানে খারাপ কী দেখলেন। মিম বানাইছে। হুদাই সবাইকে শত্রু বানানোর দরকার নাই। এটাকে পজিটিভলি নেন। সে মিমের মাধ্যমে হলেও স্বীকার তো করছে যে শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ বানাইছেন। বরং এই মিমকে শেয়ার দেন। এটা আমাদের পক্ষের মিম।’

এসব মন্তব্যের পর Aronno Abir এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান বলে তার পরবর্তী কার্যক্রম থেকে ধারণা পাওয়া যায়। কিছু সময়ের মধ্যেই তিনি এ সংক্রান্ত নিজের দুটি পোস্টই সরিয়ে নেন। পরে আরেকটি পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এমন একটা মিমসে নেত্রীর ছবি লাগাইছে সেটা পজিটিভ মনে হয় আপনাদের কাছে? যে মিমসটা নরমালি ইউজ করা হয় ‘দে চাটনি, বেকার খাটনি’ টেম্পলেটের জন্য।’
অন্যদিকে, এক পর্যায়ে আতিকের পেজ থেকেও মূল পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ঘটনাটির আর কোনো পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া না ঘটায় বিষয়টি এখানেই থেমে যায়।
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, অনলাইনে রাজনৈতিক বিরোধ বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় বেশ দ্রুত ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং নারীর প্রতি অশ্লীল ও হয়রানিমূলক আচরণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি পোস্টকে ভুলভাবে নেতিবাচক প্রচার হিসেবে ব্যাখ্যা করার পরই আতিকের স্ত্রীকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর ছবি তৈরি ও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান ওঠে। যদিও পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই ভিন্নমত তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আর বাড়েনি, তবে এমন আহ্বান বাস্তবে নারীদের অনলাইন নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মানসিক সুরক্ষার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এফএ




