শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলায় কার্যকর পদক্ষেপ চায় সিআইপিজি

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

শেয়ার করুন:

দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও আইনশৃঙ্খলায় কার্যকর পদক্ষেপ চায় সিআইপিজি

সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবাধিকার সুরক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং জুলাই চার্টার ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।

শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স (সিআইপিজি) আয়োজিত ‘সরকারের ৬ মাস: প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও ঘাটতির মূল্যায়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আলোচনায় সরকারের প্রথম ছয় মাসের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে। এরপর মানুষ যে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশের প্রত্যাশা করেছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে তা মূল্যায়নের সময় এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন বিবেচনা না করে অ্যারাবিক বিভাগের একজন অধ্যাপককে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, সরকারের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস দীর্ঘ সময় না হলেও নীতি, অগ্রাধিকার ও বাস্তবায়নের গতিপথ বোঝার জন্য এ সময় যথেষ্ট।

বিশেষ অতিথি অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আবু আহমেদ বলেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কৃষি কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ঋণে আগ্রহী হচ্ছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তিনি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া ও বেকারত্ব বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত নতুন আইনি কাঠামোর সমালোচনা করে বলেন, এসব ব্যবস্থায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষার পরিবর্তে অভিযুক্তদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। র‌্যাবের পরিবর্তে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনকে তিনি ‘খোলস পরিবর্তন’ হিসেবে অভিহিত করেন।

র‌্যাবের নথিপত্র হস্তান্তরের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া এবং নতুন আইনে আটক সংক্রান্ত সংজ্ঞা ও মেয়াদ স্পষ্ট না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাজুল ইসলাম। একই সঙ্গে জুলাই সনদের প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন না হওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।

ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) মো. আবদুল বাতেন বিচার বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তে দলীয় প্রভাবযুক্ত সার্চ কমিটির মাধ্যমে বিচারক নিয়োগের সুযোগ থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠা করা বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাতিলেরও সমালোচনা করেন তিনি।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং মানবাধিকারসংক্রান্ত আইনের বিভিন্ন বিধানের সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, এসব আইন নিয়ে বিতর্ক থেকে জনদৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতে সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইন সামনে আনা হয়েছে। গুম ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আইনের অস্পষ্ট বিধান ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, গত ছয় মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও রপ্তানিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা স্বস্তি এসেছে, সেটিকেও অর্থনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গোলটেবিল আলোচনায় সরকারের আগামী দিনের কার্যক্রমে পাঁচটি অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানায় সিআইপিজি। এগুলো হলো মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ; মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা; ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ; যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি; এবং জুলাই চার্টার ও নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সময়বদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক রোডম্যাপ প্রকাশ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সিআইপিজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক। সমাপনী বক্তব্যে সিআইপিজির নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. খুরশীদ আলম অতিথি, আলোচক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ধন্যবাদ জানান।

টিএই/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর