কয়েক সপ্তাহ কিছুটা কম থাকার পর দেশে আবারও বেড়েছে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ উৎপাদনে একের পর এক সংকট তৈরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমে গেছে। সর্বশেষ ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট এবং আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, হঠাৎ করে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। সেটি দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। একই সময়ে আরএনপিএলের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়েছে। ফলে একযোগে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আগে থেকেই থাকা সংকটও রয়েছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (এলএনডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ১১টার দিকে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াটে নেমে যায়।
কয়লা স্বল্পতার কারণে প্রায় এক মাস ধরে সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল আদানির কেন্দ্রটি। গত মাসের শেষ দিকে কয়লা সরবরাহ বাড়ায় উৎপাদনও বাড়তে শুরু করে। দিনের বেলায় প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল কেন্দ্রটি।
বুধবার রাতে উৎপাদন ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও রাত ১২টার দিকে বয়লারে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে কেন্দ্রটির উৎপাদন ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে।
কেন্দ্রটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বয়লারের ত্রুটির কারণে ইউনিটটি ঠান্ডা হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। এরপর মেরামতের কাজ শুরু হবে। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
শুধু আদানির কেন্দ্রেই নয়, গ্যাস ও কয়লার সংকটেও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পিডিবি সূত্র বলছে, দুই মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমেছে। এতে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ রয়েছে। পটুয়াখালীর আরেকটি কেন্দ্র এবং বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা-সংকটের প্রভাব পড়েছে।
কারিগরি ত্রুটিতে আশুগঞ্জের ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকায় গ্যাস-সংকটের কারণে অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় চলছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার হিসাবে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। এ সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট।
ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের বড় ব্যবধানের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে যায়। শহরাঞ্চলে দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও জ্বালানি-সংকট ও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে আবারও বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ইউনিটটি দ্রুত চালু করা না গেলে আগামী কয়েক দিনও লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
জেবি




