১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযান শুরু হয়েছে। গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠছে চারপাশ। মধুসূদন দে, শিক্ষার্থীদের ‘মধুদা’ তখন নিজের বাসায়।
সেনারা সেখানে হানা দেয়। পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। মধুসূদন দে আহত হন, পরে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ হলের মাঠে। সেখানে শিক্ষার্থীর সঙ্গে তাঁকেও হত্যা করা হয়।
যে মানুষটি বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের চা-নাশতা দিয়েছেন, বাকিতে খাবার দিয়েছেন, রাজনৈতিক বিতর্ক শুনেছেন শেষ পর্যন্ত তিনিও হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ।
তারও আগে কয়েক দশক ধরে তাঁর ক্যান্টিনের টেবিল ঘিরেই জমেছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায়। এটি আজকের মধুর ক্যান্টিন।
ক্যান্টিনের বয়স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান। মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাস শুরু হয় ১৯২১ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়। মধুসূদন দে-র বাবা আদিত্যচন্দ্র দে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পাসে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় তিনি মিষ্টি ও নানা ধরনের খাবার বিক্রি করতেন। তখন অবশ্য এর নাম ‘মধুর ক্যান্টিন’ ছিল না।
১৯৩৪-৩৫ সালের দিকে কিশোর মধুসূদন দে বাবার কাজে সহযোগিতা করতে শুরু করেন। ১৯৩৫ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনিই ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘মধুদা’। তাঁর জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে ক্যান্টিনটিও পরিচিত হয়ে যায় ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে।
একটি খাবারের দোকান তখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছিল এমন এক জায়গায়, যেখানে শুধু খাবার নয় আলোচনা হতো রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে।
যে ভবনে আগে ছিল নবাবদের দরবার
মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাসের আরও একটি বিস্ময়কর অধ্যায় রয়েছে এর ভবনটিকে ঘিরে।
আজ যেখানে শিক্ষার্থীদের আড্ডা বসে, সেই স্থাপনাটি একসময় ঢাকার নবাব পরিবারের দরবার হল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সভা ছাড়াও সেখানে স্কেটিং রিং ও বলরুম ছিল। ভবনটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৮৭৩ সালে এবং কয়েক বছর ধরে এর কাজ চলে।
অর্থাৎ মধুর ক্যান্টিনের বর্তমান ভবন শুধু ছাত্ররাজনীতির সাক্ষী নয়; এর দেয়ালের সঙ্গে যুক্ত আছে ঔপনিবেশিক ঢাকার নবাব পরিবারের সামাজিক ইতিহাসও।
এখানেই হয়েছিল মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন
মধুর ক্যান্টিন ভবনের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর একটি ১৯০৬ সালের। ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯০৬ সালে এখানে অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকেই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয় এবং ৩০ ডিসেম্বর সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হয়।
একই জায়গা পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশবিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী ছাত্ররাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে ইতিহাসের এই পরিহাসই মধুর ক্যান্টিনকে অন্য অনেক স্থাপনা থেকে আলাদা করেছে।
বাকির খাতায় জমেছিল ছাত্রজীবনের গল্প
মধুদার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক ছিল কেবল দোকানদার ও ক্রেতার নয়। অনেক শিক্ষার্থী খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিতে পারতেন না। মধুদা তাঁদের বাকিতে খেতে দিতেন। তাঁর কাছে নাকি এমন একটি খাতা ছিল, যার নাম ছিল ‘না দিয়ে উধাও’। সেখানে অনেক পরিচিত মানুষের নামও ছিল বলে তাঁর পরিবারের সদস্য ও সাবেক শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। খাতাটি অবশ্য মধুদার মৃত্যুর পর আর পাওয়া যায়নি।
মধুদার ছেলে অরুণ কুমার দে-র স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তাঁর বাবা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের বিষয়ে খুব বেশি কঠোর ছিলেন না। অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থীকে তিনি সহযোগিতাও করতেন।
ফলে ক্যান্টিনটি ধীরে ধীরে শুধু খাবারের জায়গা থাকেনি; শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছিল এক ধরনের আশ্রয়স্থল।
ভাষা আন্দোলনের দিনগুলো
১৯৪৮ সাল থেকে ভাষার প্রশ্নে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন শুরু হয়, তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মধুর ক্যান্টিনও হয়ে ওঠে ছাত্রনেতা ও কর্মীদের নিয়মিত বৈঠকের জায়গা।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির দিনও মধুর ক্যান্টিন ও এর সামনের আমতলা ছিল আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেদিন সকালে আমতলায় সভা হয় এবং পরে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেখান থেকেই শিক্ষার্থীদের মিছিল এগিয়ে যায় মেডিকেল কলেজের দিকে। পরে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিকসহ অনেকে শহীদ হন।
মধুর ক্যান্টিন তখন আন্দোলনের প্রস্তুতি, সিদ্ধান্ত ও সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
রাজনীতির পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতির আড্ডা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, লেখক, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদেরও নিয়মিত আড্ডার জায়গা ছিল এটি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, আবদুল আহাদ, ফতেহ লোহানী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহসহ অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এখানে আসতেন বলে বিভিন্ন স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়।
কবি বুদ্ধদেব বসুও ছাত্রজীবনে এই ক্যান্টিনে আসতেন। তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই সময়ের ছোট্ট খাবারের দোকান, সীমিত খাবারের তালিকা এবং বাকিতে খাওয়ার গল্প।
এ কারণেই মধুর ক্যান্টিনকে শুধু রাজনৈতিক আড্ডাখানা বললে এর ইতিহাসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতিও হয়েছে এখানে
পঞ্চাশের দশকের ভাষা আন্দোলনের পর ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরও তীব্র হতে থাকে।
১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে মধুর ক্যান্টিন হয়ে ওঠে ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা এখানে বসে কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন এবং সেখান থেকেই মিছিল বের হতো।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও মধুর ক্যান্টিন ছিল আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তখন পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনের প্রধান ঘাঁটি। আর সেই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্রগুলোর একটি ছিল মধুর ক্যান্টিন।
১৯৭১: মধুদার শেষ রাত
১৯৭১ সালের মার্চ। দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল ছাত্রসমাজ। মধুর ক্যান্টিনে প্রতিদিনের মতোই চলছে রাজনৈতিক আলোচনা।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় হত্যাযজ্ঞের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে।
২৬ মার্চের প্রথম দিকে সেনারা মধুসূদন দে-র বাসায় হামলা চালায়। তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। মধুসূদন দে আহত অবস্থায় আটক হন। পরে তাঁকে জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। মধুদা আর ফিরে আসেননি।
যুদ্ধের পরও থামেনি মধুর ক্যান্টিন
মুক্তিযুদ্ধের পর মধুসূদন দে-র ছেলে অরুণ কুমার দে ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার কথা তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন।
এরপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকে মধুর ক্যান্টিন।
স্বাধীনতার পর ছাত্ররাজনীতি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিভিন্ন সময়ে মধুর ক্যান্টিন আবারও ছাত্রসমাজের আলোচনার কেন্দ্র হয়েছে।

মধুদার ভাস্কর্য
১৯৯৫ সালে চারুকলার শিক্ষার্থী তৌফিক হোসেন খান মধুসূদন দে-র একটি ভাস্কর্য তৈরি করেন। সেটি আজও মধুর ক্যান্টিনের সামনে তাঁর স্মৃতির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
ভাস্কর্যের পাশে কবি শামসুর রাহমানের ‘মধুস্মৃতি’ কবিতাটিও মধুদার স্মৃতিকে আরও গভীরভাবে ধারণ করে।
প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী ভাস্কর্যটির পাশ দিয়ে ক্যান্টিনে ঢোকেন। কেউ হয়তো জানেন মধুদা কে ছিলেন, কেউ হয়তো জানেন না। কিন্তু তাঁর নামে থাকা জায়গাটি এখনও বয়ে নিয়ে চলেছে সেই ইতিহাস।
একটি ক্যান্টিন যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিভান্ডার
মধুর ক্যান্টিনের ইতিহাসের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় এটি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়, কোনো একটি আন্দোলনেরও নয়। এখানে একসময় জমেছে ভাষার অধিকারের দাবি। এখান থেকে বেরিয়েছে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিল। এখানে বসেছে বিভিন্ন মতের ছাত্রনেতাদের বৈঠক। এখানে সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আড্ডা হয়েছে। এবং এই জায়গার সঙ্গে যুক্ত একজন সাধারণ ক্যান্টিন পরিচালকের জীবন শেষ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত রাতে।
মধুর ক্যান্টিনকে শুধু ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ক্যান্টিন’ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত ইতিহাস ধরা পড়ে না। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মৃতিস্থান।
১৯২১ সালে যে ক্যান্টিনের যাত্রা শুরু হয়েছিল খাবার আর মিষ্টির দোকান হিসেবে, শত বছর পরও তার টেবিলগুলোতে বসে শিক্ষার্থীরা আড্ডা দেন, বিতর্ক করেন, রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন।
সময় বদলেছে, শিক্ষার্থীদের পোশাক বদলেছে, রাজনীতির ভাষা বদলেছে, ক্যাম্পাসের চেহারা বদলেছে।
এম/এএইচ



