সন্তান, নাতি-নাতনি কিংবা নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দান করার পর অনেক প্রবীণ ব্যক্তিই ভোগ-দখল হারানোসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। দান করা সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া, দাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কিংবা শেষ বয়সে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থায় প্রবীণ দাতার অধিকার সুরক্ষায় ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’ ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন নিবন্ধন সংশ্লিষ্টরা।
নিবন্ধন কর্মকর্তাদের মতে, প্রচলিত হেবার ঘোষণাপত্র, দানের ঘোষণাপত্র ও দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি দানের পর দানগ্রহীতার মালিকানা সৃষ্টি হতে পারে। পরবর্তীতে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দানগ্রহীতা নিজের নামে নামজারি করে সম্পত্তি হস্তান্তরও করতে পারেন। কিন্তু দাতা যদি ভোগ-দখলের অধিকার নিজের কাছে সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান করেন, তাহলে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় তার ভোগ-দখলের অধিকার বহাল রাখার সুযোগ থাকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যেখানে বয়স্ক বাবা-মা সন্তানকে কিংবা দাদা-দাদি নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পর বিপাকে পড়েছেন। সম্পত্তি পাওয়ার কিছুদিন পর দানগ্রহীতা সেটি বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা বৃদ্ধ দাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। তখন দাতা দলিল বাতিলের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে ছুটে আসেন।
তবে নিবন্ধন কর্মকর্তারা জানান, সাব-রেজিস্ট্রারের নিবন্ধিত দলিল বাতিল করার ক্ষমতা নেই। সাব-রেজিস্ট্রার আইন অনুযায়ী দলিল নিবন্ধন করতে পারেন; কিন্তু নিবন্ধিত দলিল বাতিলের বিষয়টি উপযুক্ত আদালতের এখতিয়ার। ফলে সম্পত্তি দানের সময়ই দাতার ভবিষ্যৎ ভোগ-দখলের অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’ ব্যবস্থাকে প্রবীণ দাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ ব্যবস্থায় দাতা সম্পত্তি দান করলেও জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর সংশ্লিষ্ট বিধানে সংযোজনের মাধ্যমে এ ধরনের দানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে নিবন্ধন সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আইনগত বিধান অনুসরণ করে ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান করা সম্ভব।
নিবন্ধন সংশ্লিষ্টরা জানান, মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে নির্দিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে হেবা বা হেবার ঘোষণাপত্রের প্রচলন রয়েছে। অন্যদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী দানের ঘোষণাপত্রের বিধান রয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থা সব ধর্মাবলম্বীর জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় এটি একটি সর্বজনীন সুযোগ তৈরি করেছে বলে তারা মনে করছেন।
তাদের ভাষ্য, নতুন এই বিধান চালু হলেও প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা হেবার ঘোষণাপত্র কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থার ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। এসব প্রচলিত ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল থাকবে।
নিবন্ধন সংশ্লিষ্টদের মতে, জীবনের শেষ সময়ে সন্তান বা নিকটাত্মীয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রবীণদের জন্য সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দাতা তার সম্পত্তি উত্তরাধিকারী বা পছন্দের ব্যক্তিকে দান করার পাশাপাশি নিজের জীবদ্দশার ভোগ-দখলের অধিকারও সংরক্ষণ করতে পারবেন।
বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিআরএসএ)-এর পক্ষ থেকে এ ধরনের আইনগত পরিবর্তনের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ধন্যবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় এ সংযোজন যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিআরএসএ)-এর মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ বলেন “বাস্তব জীবনে আমরা অনেক সময় দেখি, বাবা-মা বা বয়স্ক ব্যক্তিরা সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দেওয়ার পর নিজেরাই সমস্যায় পড়ছেন। পরবর্তীতে দলিল বাতিলের জন্য তারা সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে আসেন। কিন্তু নিবন্ধন কর্মকর্তার নিবন্ধিত দলিল বাতিলের ক্ষমতা নেই। এ বাস্তবতায় ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দানের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি এ ব্যবস্থাকে সময়পোযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংযোজন” হিসেবে উল্লেখ করেন।




