সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২২ এএম

শেয়ার করুন:

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর তাগিদ

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা জরুরি বলে মত দিয়েছেন সরকার, কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ এবং মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, সংকটকে শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে হবে না, এর সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিআইআইএসএস মিলনায়তনে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কোঅপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: ইমার্জিং চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড রিফ্রেমিং রেসপন্স স্ট্র্যাটেজিস’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট শুধু বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ কমাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে মিয়ানমারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কার্যকর রূপরেখা তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ কোনো ধরনের সংঘাত চায় না। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই বাংলাদেশের লক্ষ্য।

ইসমাইল জবিউল্লাহ আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো রূপরেখা না থাকার অন্যতম কারণ আগের সরকারের ব্যর্থতা। তবে বর্তমান সরকার এ সংকট সমাধানে আত্মবিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর ও টেকসই সমাধান হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে পারে না। মিয়ানমারকে দ্রুত এ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। সংকট সমাধানে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এএসএম রিদওয়ানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে প্রথমেই তাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে আসছে।

চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরকেও সংকট সমাধানে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মত দেন তিনি। আরাকানের মধ্য দিয়ে এ করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন সহযোগিতা করতে পারে।

মানবাধিকারকর্মী ও এ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্র তাদের মানবিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে মানবিক সহায়তা দেওয়ার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘায়িত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

ওসমানী সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের চেয়ারম্যান লে. জে. (অব.) ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, ১৯৭৯ ও ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল। তার মতে, তখন বাংলাদেশের কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা ছিল।

২০০৮ সালের ‘গানবোট কূটনীতি’র উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা না থাকায় মিয়ানমার আগের মতো বাংলাদেশকে ভয় পায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগকে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর রাজনৈতিক চাপে রূপান্তর করতে না পারলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

রিফিউজি রিলিফ অ্যান্ড রিপ্যাট্রিয়েশন কমিশনারের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে যুদ্ধাবস্থার মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বিত নির্দেশিকা বা কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত নির্দেশিকা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

দৈনিক প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি রাহিদ এজাজ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনায় স্থানীয় জনগণ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে, সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেনাশাসনের পর রাখাইনের পরিস্থিতিও অনেকটা বদলে গেছে।

রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে বিবেচনা না করে রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি ক্যাম্পের নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে সমন্বিত কৌশলের আওতায় আনতে হবে।

গোলটেবিল আলোচনায় সরকার, নিরাপত্তা ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী। স্বাগত বক্তব্য দেন আইজিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আদনান রহমান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইজেন, ইউল্যাবের শিক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অবন্তী হারুন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার উইংয়ের মহাপরিচালক মো. তৌফিকুর রহমান, আইইউবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল হুদা সাকিবসহ অনেকে।

এমআর/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর