একসময় যেখানে ছিল মুঘলদের রাজকীয় বাগান, পরে সেখানে গড়ে ওঠে নবাবদের বাগানবাড়ি। সেই বাগ-ই-বাদশাহীই সময়ের সঙ্গে লোকমুখে পরিচিতি পেয়েছে শাহবাগ নামে। বর্তমানে ঢাকার শাহবাগ ঘুরে দেখলে সেই পুরোনো ইতিহাসের অনেক চিহ্নই আর চোখে পড়ে না। কিন্তু বর্তমানের ব্যস্ত এই মোড়ের নামকরণের পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস।
‘রাজাদের বাগান’ থেকে শাহবাগ
আজকের শাহবাগকে ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে সবাই চেনে। কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে এই অঞ্চল ছিল নগরকেন্দ্রের বাইরের একটি বিস্তীর্ণ বাগান ও খোলা এলাকা।
মুঘল আমলে বর্তমান হাইকোর্ট ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমি এলাকার দিকে বিস্তৃত ছিল ‘বাগ-ই-বাদশাহী’। ফারসি ভাষার এই নামের অর্থ ‘বাদশাহর বাগান’ বা ‘রাজকীয় বাগান’। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মুঘল ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাগান এলাকা।
তখনকার ঢাকা আজকের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ছিল না। পুরান ঢাকা ছিল মূল নগরকেন্দ্র। এর বাইরে উত্তর দিকে ছিল বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা, বাগান ও বাগানবাড়ি। বাগ-ই-বাদশাহীও ছিল সেই বহিরাঞ্চলের অংশ।
সময় গড়ানোর সঙ্গে মুঘল শাসনের পতন ঘটে। ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্বও একপর্যায়ে কমে যায়। তবে এই অঞ্চলের বাগান ও খোলা জায়গাগুলো পরবর্তী সময়ে নতুন করে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
নবাবদের হাতে নতুন রূপ
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে শাহবাগ অঞ্চলের চেহারা বদলাতে শুরু করে। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার নতুন অভিজাত শ্রেণি এবং ইউরোপীয় কর্মকর্তারা রমনা ও শাহবাগ এলাকায় বাগানবাড়ি নির্মাণ করতে থাকেন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সুজাতপুর এলাকায় আর্মেনীয় ভূস্বামী আরাতুন এবং ব্রিটিশ বিচারক গ্রিফিথ কুক বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন। পরে খাজা আলিমুল্লাহ ওই বাগানবাড়ি দুটি কিনে নেন। এরপর ঢাকার নবাব পরিবারের হাতে শাহবাগের বিস্তীর্ণ এলাকা নতুন রূপ পায়।
১৮৬৮ সালে নবাব আবদুল গণি জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তার ছেলে খাজা আহসানুল্লাহর হাতে দেন। এর কয়েক বছর পর তিনি শাহবাগে নিজের জন্য একটি বিশাল বাগানবাড়ি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ১৮৭৩ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। কয়েক বছর ধরে চলা সেই কাজের মাধ্যমে তৈরি হয় বিশাল এক বাগানবাড়ি।
মুঘলদের পুরনো রাজকীয় বাগানের আদলে সাজানো এই নতুন বাগানবাড়ির নাম দেওয়া হয় ‘শাহবাগ’। অর্থাৎ পুরনো বাগ-ই-বাদশাহীর স্মৃতিই যেন নতুন নামে ফিরে আসে।
কেমন ছিল সেই শাহবাগ?
আজকের শাহবাগের সঙ্গে সেই সময়ের শাহবাগের পার্থক্য ছিল আকাশ-পাতাল। প্রায় ২০০ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত ছিল নবাবদের শাহবাগ বাগানবাড়ি। সেখানে ছিল নানা রঙের ফুল-ফলের গাছ, চৌবাচ্চা, ফোয়ারা, পুকুর ও নান্দনিক বাগান। বাগানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘ইশরাত মঞ্জিল’ নামে দ্বিতল ভবন।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, শাহবাগে নবাবদের একটি চিড়িয়াখানাও ছিল। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি রাখা হতো। যাত্রা, পুতুলনাচ, ম্যাজিক ও বায়োস্কোপের আয়োজনও করা হতো। তবে সাধারণ সময়ে বাগানে সবার প্রবেশাধিকার ছিল না; বিশেষ অনুমতি নিয়ে চিড়িয়াখানা দেখার সুযোগ পাওয়া যেত।
শাহবাগের সৌন্দর্য তখনকার কবি-সাহিত্যিকদেরও আকৃষ্ট করেছিল। বাগানের সৌন্দর্য দেখে কবি উবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী ও আবদুল গফুর নাসসাখ কবিতা রচনা করেছিলেন বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ শাহবাগ তখন শুধু একটি বাগানবাড়ি ছিল না; এটি ধীরে ধীরে ঢাকার অভিজাত সমাজের বিনোদন ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
ঘোড়দৌড়, সাহেবদের আয়োজন আর শাহবাগ
শাহবাগের সঙ্গে পাশের রেসকোর্স ময়দানেরও (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। উনিশ শতকে ঢাকায় ঘোড়দৌড় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রেসকোর্সে প্রতিযোগিতা দেখতে আসতেন ইংরেজ সাহেব-মেম এবং ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা। ঘোড়দৌড় উপলক্ষে শাহবাগের বাগানবাড়িতে ভোজসভা ও বল নাচের আয়োজন করা হতো। নবাবদের ঘোড়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ঘোড়াগুলোর জন্যও শাহবাগে আস্তাবল ছিল।
শাহবাগের এই সামাজিক ও বিনোদনকেন্দ্রিক চরিত্র ধীরে ধীরে তাকে ঢাকার অভিজাত সমাজের অন্যতম কেন্দ্র করে তোলে।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথমভাগে এখানে শুধু পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংবর্ধনাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শাহবাগে সংবর্ধনা পেয়েছেন। ১৯০৪ সালে লর্ড কার্জনও শাহবাগের বাগানবাড়ি পরিদর্শন করেন।
ইশরাত মঞ্জিল থেকে মুসলিম লীগের জন্ম
শাহবাগের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯০৬ সালের শেষদিকে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সমিতির অধিবেশন। ওই অধিবেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ শাহবাগে অনুষ্ঠিত অধিবেশনেই সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নবাব খাজা সলিমুল্লাহসহ তৎকালীন মুসলিম নেতারা এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
অর্থাৎ যে জায়গাটিকে একসময় শুধু নবাবদের বাগানবাড়ি ও বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে দেখা হতো, সেই শাহবাগই একসময় ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির গতিপথে প্রভাব ফেলা একটি রাজনৈতিক সংগঠনের জন্মের সাক্ষী হয়ে ওঠে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্পও জড়িয়ে আছে
শাহবাগের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ রয়েছে। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নবাব খাজা সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের মুসলিম প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সাক্ষাৎ হয় শাহবাগে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ওই সাক্ষাতে হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন।
পরে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে শাহবাগ ও এর আশপাশের এলাকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। শাহবাগের বিস্তীর্ণ বাগানবাড়ির অংশবিশেষ পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়।
আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন, টিএসসি এবং জাতীয় জাদুঘর-সংলগ্ন যে এলাকা আমরা দেখি, তার সঙ্গে ঐতিহাসিক শাহবাগ বাগানবাড়ির বিস্তৃত এলাকার সম্পর্ক ছিল।
নবাবদের পতনের সঙ্গে বদলে যায় শাহবাগ
১৯১৫ সালে নবাব খাজা সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর নবাব পরিবারের আর্থিক ও জমিদারি কাঠামো দুর্বল হতে শুরু করে। এর প্রভাব পড়ে শাহবাগের ওপরও।
নবাব পরিবারের সম্পত্তি ধীরে ধীরে ভাগ হতে থাকে। একসময়কার জাঁকজমকও কমতে থাকে। বিশ শতকের চল্লিশের দশকের শুরু পর্যন্ত শাহবাগে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও আগের সেই জৌলুস আর ছিল না। এরপর ঢাকা বদলেছে, বদলেছে শাহবাগও।
একসময় যেখানে ছিল বিশাল বাগান, পুকুর, ফোয়ারা, চিড়িয়াখানা ও বাগানবাড়ি, সেখানে গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, জাদুঘর, সড়ক ও আধুনিক নগর অবকাঠামো।
নামটি টিকে গেল, বদলে গেল জায়গাটি
শাহবাগের নামের ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো নামটি পুরনো রাজকীয় বাগানের স্মৃতি বহন করলেও জায়গাটির চরিত্র বারবার বদলেছে।
মুঘল আমলের বাগ-ই-বাদশাহী থেকে নবাবদের শাহবাগ বাগানবাড়ি; সেখান থেকে ব্রিটিশ ও ঔপনিবেশিক ঢাকার সামাজিক কেন্দ্র; এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আধুনিক নগরায়ণ প্রতিটি পর্যায়ে শাহবাগ নতুন পরিচয় পেয়েছে।
আজকের শাহবাগে দাঁড়িয়ে সেই বাগানবাড়ির বিশালত্ব কল্পনা করা কঠিন। গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড়, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর আর অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের মাঝখানে হারিয়ে গেছে পুরনো বাগানের অধিকাংশ চিহ্ন। তবু নামটি রয়ে গেছে।
‘শাহবাগ’ দুটি শব্দের এই নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে মুঘল ঢাকার রাজকীয় বাগান, নবাব পরিবারের ঐশ্বর্য, ব্রিটিশ আমলের সামাজিক জীবন, মুসলিম লীগের জন্ম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং আধুনিক ঢাকার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দীর্ঘ যাত্রা।
একসময় যার পরিচয় ছিল ‘বাগ-ই-বাদশাহী’ বাদশাহর বাগান, সেই জায়গাই আজ বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত নগরকেন্দ্র। নাম বদলায়নি শুধু; বরং সময়ের সঙ্গে তার অর্থ ও ইতিহাস আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এম/এএইচ



