শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগের রেকর্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

শেয়ার করুন:

পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগের রেকর্ড
ছবি- এআই দিয়ে তৈরি

চিঠি ও প্যাকেটের পাশাপাশি গ্রাহকের কাছে এখন ফ্রিজ, মোটরসাইকেলের মতো ভারী পণ্যও পাঠিয়েও রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। গত দুই মাসে স্পিড পোস্টে প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম কেজিতে ১০ টাকা, এরপর প্রতি কেজিতে আরও ৫ টাকা-এই মাশুলেই চলছে স্পিড পোস্ট।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন ডাক অধিদফতরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম।

মহাপরিচালক বলেন, দেশের আইনে অবৈধ নয়, এমন যেকোনো পণ্যই এখন ডাকের গাড়িতে তোলা, নামানো এবং পোস্টম্যানের মাধ্যমে বিলি করা যায়। সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলও ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। সঙ্গে গেছে ফ্রিজ, আলমারি ও ওয়ারড্রবের মতো বড় আসবাবপত্র। শিক্ষার্থীদের কাঁথা-বালিশ ও বিছানাপত্রও পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া রান্নাঘরের দা-বঁটি-ছুরি, হাঁড়ি-পাতিল, প্রেসার কুকার, ইন্ডাকশন চুলা থেকে শুরু করে এলইডি টিভি, এয়ার কন্ডিশনার, বাইসাইকেল এমনকি কীটনাশক স্প্রে মেশিনও এখন ডাকযোগে পাঠানো যাচ্ছে।

তিনি বলেন, মৌসুমি ফলসহ স্পিড পোস্টের মাধ্যমে গত দুই মাসে মোট প্রায় ৪০০ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে, যা এর আগে ডাক বিভাগের মাধ্যমে কখনো পরিবহন হয়নি। এসব পণ্য যেন সহজে ও সুন্দরভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য সেবাটিকে গ্রাহকবান্ধব করতে বাড়তি কিছু ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের সুবিধার জন্য চালু হয়েছে অনলাইন মাশুল ক্যালকুলেটর। এর মাধ্যমে আগে থেকেই পণ্য পরিবহনের খরচ জেনে নেওয়া যায়।

বর্তমানে রাজধানীর জিপিওসহ গুলশান, বনানী, মিরপুর ও উত্তরার মতো বেশ কয়েকটি সাব-পোস্ট অফিস থেকে সরাসরি পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পার্সেলের জন্য রয়েছে বৈদেশিক ইএমএস সেবাও।

তিনি বলেন, সেবাটি যেন সুশৃঙ্খলভাবে চলে, সেজন্য এর কার্যপ্রণালী সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে ডাক অধিদফতর। স্পিড পোস্টে ইস্যুকৃত পণ্য জেলা শহর থেকে ঢাকায় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা, এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা আর প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে বিলির জন্য প্রস্তুত রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট পোস্ট অফিসকে।  তবে, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে কিছু দ্রব্য এই সেবার আওতার বাইরেও রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ, ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক রাসায়নিক দ্রব্য, মাদকদ্রব্য, জীবন্ত প্রাণী, আগ্নেয়াস্ত্র এবং ভরা বা খালি গ্যাস সিলিন্ডার স্পিড পোস্টে পাঠানো যাবে না।

এত কম মূল্যে সেবা দেওয়ার কারণ হিসেবে কাজী আসাদুল বলেন, টাকার অঙ্কের চেয়ে মানুষে-মানুষে সংযোগ স্থাপনকে আমি বড় অর্জন বলে মনে করি। একজন মা যেমন কষ্ট করে সন্তান লালন-পালন করেন, বিনিময়ে কিছুই চান না; সন্তানের ভালো থাকাতেই যার তৃপ্তি- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডাক বিভাগও তেমনি জনগণকে সেবা দিতে পারার মধ্যেই সার্থকতা খুঁজে পায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাক বিভাগের এ সেবার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গত সংসদ নির্বাচনে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি ভোটার পোস্টাল ভোট দিতে নিবন্ধন করেন। এরপর ভোট দেওয়া থেকে শুরু করে সেই ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে মুহূর্তে মুহূর্তে বার্তা পেয়ে ভোটের অগ্রগতি জানতে পেরেছেন প্রবাসীরা। এতে করে ডাক বিভাগের প্রতি তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়েছে।

ডাক অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, এই অভিজ্ঞতাই পরে বিনা প্রচারণায় মুখে মুখে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররাই এই সেবা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছেন। তারাই নিজ উদ্যোগে তারা সেবাটির প্রচারে ভূমিকা রেখেছেন।

এই জনপ্রিয়তা ডাক বিভাগের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি একজন গ্রাহক বদলি হয়ে অন্য জেলায় বাসা পরিবর্তনের সময় পুরো বাসার আসবাবপত্রই ডাকযোগে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিশ্বের অনেক দেশের ডাক বিভাগ এমন আন্তঃজেলা বাসাবদল সেবা দিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশেও এমন সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব একটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে ৫০টি বৈদ্যুতিক বাইক, যা চলবে গ্রিন এনার্জিতে।

সক্ষমতা বাড়ানোর এই ধারাবাহিকতায় বদলেছে ডাক বিভাগের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিকল্পনাও। মহাপরিচালক বলেন, সহকর্মীদের নিয়ে দিনব্যাপী এক কর্মশালার পর সম্প্রতি সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকার তেজগাঁওয়ের কেন্দ্রীয় মেইল প্রসেসিং সেন্টারকে শতভাগ কাজে লাগানো হবে। 

এর মধ্য দিয়ে সারা দেশ থেকে ঢাকামুখী মেইল, ঢাকা থেকে সারাদেশে যাওয়া মেইল আর ঢাকা শহরের ভেতরকার মেইল- সবই প্রক্রিয়াজাত হবে একটি জায়গা থেকে। এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে কার্যকরও হয়েছে বলে জানান তিনি।

কমলাপুরের রেলওয়ে মেইল সার্ভিসের বর্তমান সক্ষমতা এখন সীমিত হয়ে পড়েছে জানিয়ে আসাদুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষার খাতা কিংবা গাছের চারার মতো নানা রকম পণ্য একসঙ্গে সামলানো ক্রমেই তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। তাই ঢাকা জিপিও ক্যাম্পাসকে সম্প্রসারিত করে সেখানে শুধু বিদেশগামী ও বিদেশ থেকে আসা রফতানি-আমদানি পার্সেলের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এভাবে তেজগাঁও ও কমলাপুরসহ মোট তিনটি হাব মিলিয়ে সমন্বিতভাবে চলবে ডাক বিভাগের মেইল ব্যবস্থাপনা।

মহাপরিচালক বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে লাভের অঙ্ক আমাদের কাছে মুখ্য নয়। সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ সেবা দিয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে একসূত্রে যুক্ত করাই হবে স্পিড পোস্টের প্রকৃত সাফল্য।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে চালু হয় স্পিড পোস্ট সেবা। প্রথমে মৌসুমি ফল পরিবহনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই সেবা এখন সম্প্রসারিত হয়েছে নিত্যব্যবহার্য বড় বড় পণ্যসামগ্রী পরিবহনেও। সূত্র: বাসস

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর