জুলাইয়ে সড়কে ঝরেছে ৭৩৯ প্রাণ, দুর্ঘটনা বেশি দিনে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট ২০২২, ০৩:১১ পিএম
জুলাইয়ে সড়কে ঝরেছে ৭৩৯ প্রাণ, দুর্ঘটনা বেশি দিনে
ফাইল ছবি

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা কমছেই না। প্রতিনিয়ত সড়কে প্রাণহানির বেড়েই যাচ্ছে। আহতের সংখ্যাও দীর্ঘ হচ্ছে। গতমাস জুলাইয়ে দেশের সড়কগুলোতে ৬৩২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ ঝরেছে ৭৩৯ জনের। আহত হয়েছেন দুই হাজার ৪২ জন। নিহতের মধ্যে নারী ১০৫, শিশু ১০৯। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে বেশি হয়েছে দিনে। দুর্ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশ দিনে হয়েছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

শনিবার (৬ আগস্ট) সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নয়টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ইলেকেট্রনিক গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনটি।

সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাইয়ে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৫.০৬ শতাংশ ভোরে হয়েছে। এছাড়া সকালে ২৫ শতাংশ, দুপুরে ২৩.২৫ শতাংশ, বিকালে ১৯.৩০ শতাংশ, সন্ধ্যায় ৭.১২ এবং রাতে ২০.২৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, জুলাইয়ে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ২৯৮টিই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫১ জন, যা মোট নিহতের ৩৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা এক হাজার ২১৮টি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪৭ দশমিক ১৫ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ১১৮ জন পথচারী নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ১৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন, অর্থাৎ ১৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এই সময়ে ১৪টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও সাত জন নিখোঁজ রয়েছে। ২৬টি রেলপথ দুর্ঘটনায় (রেলক্রসিং দুর্ঘটনাসহ) ৪১ জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়েছে।

ঢাকা বিভাগে সবেচেয়ে বেশি ১৯৯টি দুর্ঘটনায় ২২৮ জন নিহত হয়েছেন। আর শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকায় ৪১টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও ৫৮ জন আহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ২৫১ জন (৩৩.৯৬%), বাস যাত্রী ৬১ জন (৮.২৫%), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি আরোহী ৫৫ জন (৭.৪৪%), মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার যাত্রী ৫৭ জন (৭.৭১%), থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা-মিশুক) ১৪৯ জন (২০.১৬%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-চান্দেরগাড়ি-মাহিন্দ্র-টমটম) ২৬ জন (৩.৫১%) এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-প্যাডেল ভ্যান আরোহী ২২ জন (২.৯৭%) নিহত হয়েছে।

দুর্ঘটনা সংঘটিত সড়কের ধরন নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৫২টি (৩৯.৮৭%) জাতীয় মহাসড়কে, ১৯৯টি (৩১.৪৮%) আঞ্চলিক সড়কে, ১০৯টি (১৭.২৪%) গ্রামীণ সড়কে এবং ৬৪টি (১০.১২%) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ৮টি ১.২৬% সংঘটিত হয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন সমূহের ১৪৫টি (২২.৯৪%) মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৫৭টি (৪০.৬৬%) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১২৭টি (২০.০৯%) পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৮৬টি (১৩.৬০%) যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ১৭টি (২.৬৮%) অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-প্রিজনভ্যান ২১.১০%, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি-তেলবাহী ট্যাঙ্কার-দশ চাকার লরি-ময়লাবাহী ট্রাক-ড্রামট্রাক-রেকার ৪.৪৩%, মাইক্রোবাস-প্রাইভেটকার-অ্যাম্বুলেন্স-জীপ ৪.১৮%, যাত্রীবাহী বাস ১৫.৪৩%, মোটরসাইকেল ২৬%, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা-মিশুক) ১৮.১৪%, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন-(নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-চান্দেরগাড়ি-আলগানন-টমটম-মাহিন্দ্র-ডাম্পার-পাওয়াটিলার) ৬.৭৩%, বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-প্যাডেল ভ্যান ৩.৯৪%।

দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ১২১৮ টি। (ট্রাক ১৭৯, বাস ১৮৮, কাভার্ডভ্যান ২১, পিকআপ ৫৬, প্রিজনভ্যান ১, ট্রলি ৯, লরি ৫, ট্রাক্টর ১৪, তেলবাহী ট্যাঙ্কার ও ট্যাঙ্ক লরি ৮, দশ চাকার লরি ১, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ২, রেকার ১, ড্রাম ট্রাক ১৪, মাইক্রোবাস ২৪, প্রাইভেটকার ২৩, অ্যাম্বুলেন্স ৩, জিপ ১, মোটরসাইকেল ৩১৭, থ্রি-হুইলার ২২১ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-লেগুনা-মিশুক), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৮২ (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-চান্দেরগাড়ি-আলগানন-টমটম-মাহিন্দ্র-ডাম্পার-পাওয়াটিলার) বাইসাইকেল ১৪, প্যাডেল রিকশা ২২ এবং প্যাডেল ভ্যান ১২।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারী পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ৩১.৪৮ শতাংশ, প্রাণহানি ৩০.৮৫%, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৫.১৮%, প্রাণহানি ১৪.৮৮%, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৬.৬১%, প্রাণহানি ১৭.৫৯%, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩.১৩%, প্রাণহানি ১০.২৮%, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৫.৬৯%, প্রাণহানি ৬.২২%, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৪.৯০%, প্রাণহানি ৬.৯০%, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৬%, প্রাণহানি ৬.৭৬% এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৬.৯৬%, প্রাণহানি ৬.৪৯% ঘটেছে।

ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১৯৯টি দুর্ঘটনায় ২২৮ জন নিহত হয়েছেন এই বিভাগে। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ৩১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ৪৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। একক জেলা হিসেবে গাজীপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ৪৪ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঝালকাঠি, সুনামগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁও জেলায়। এই ৩টি জেলায় ১১টি সাধারণ মাত্রার দুর্ঘটনা ঘটলেও কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। রাজধানী ঢাকায় ৪১ টি দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও ৫৮ জন আহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানায়, নিহতদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ৩ জন, সেনাসদস্য একজন, স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষক ১৩ জন, চিকিৎসক ৩ জন, প্রকৌশলী ২ জন, সাংবাদিক ৪ জন, আইনজীবী ৩ জন, বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১ জন, এনজিও কর্মকর্তা-কর্মচারী ১৪ জন, ভূমি কর্মকর্তা দুইজন, মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিন ৩ জন, প্রতিবন্ধী ২ জন, ঔষধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ৩৩ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ৪১ জন, পোশাক শ্রমিক ১১ জন, নির্মাণ শ্রমিক ৯ জন, ইউপি সদস্য ৩ জনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ১৬ জন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট-ওয়েস্ট ও ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার ১০টি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশেনের পক্ষ থেকে।

ডব্লিউএইচ/এমআর