বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আইয়ুব গেট থেকে আসাদ গেট: রক্তে লেখা যে নাম

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪০ এএম

শেয়ার করুন:

আইয়ুব গেট থেকে আসাদ গেট: রক্তে লেখা যে নাম
আসাদ গেট

রাজপথে তখন মানুষের ঢল। কারও হাতে ব্যানার, কারও কণ্ঠে স্লোগান। মিছিলের সামনে বহন করা হচ্ছে রক্তমাখা একটি শার্ট, মাত্র এক দিন আগে পুলিশের গুলিতে নিহত এক তরুণের। শোক আর ক্ষোভে উত্তাল সেই মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে মোহাম্মদপুরের দিকে। সামনে পড়ল একটি গেট নাম ‘আইয়ুব গেট’।

একজন সামরিক শাসকের নামে থাকা সেই নাম তখন আর মেনে নিতে রাজি নয় ক্ষুব্ধ জনতা। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারির সেই উত্তাল দিনেই পুরোনো পরিচয় মুছে গেটটি পরিচিত হয়ে ওঠে নতুন নামে ‘আসাদ গেট’। আগের দিন, ২০ জানুয়ারি, পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তার মৃত্যু আরও তীব্র করে তোলে পাকিস্তানি শাসনবিরোধী গণআন্দোলন।

ঢাকার ব্যস্ত সড়কে আজও দাঁড়িয়ে থাকা ‘আসাদ গেট’ - এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, এক তরুণের আত্মত্যাগ এবং শাসকের নাম মুছে শহীদের নাম প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।

2

কে ছিলেন আসাদ

আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় নেতা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শেষ বর্ষের এমএ শিক্ষার্থী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের ঢাকা হল শাখার সভাপতি ছিলেন।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ তখন ১১ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আওয়ামী লীগের ছয় দফা এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবির আন্দোলন।

২০ জানুয়ারি ১৯৬৯। ১১ দফা দাবির সমর্থনে ছাত্রদের একটি মিছিল ঢাকার রাজপথে বের হয়। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন আসাদ। পুলিশ মিছিলে গুলি চালালে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সেদিনই তাঁর মৃত্যু হয়।

মাত্র ২৭ বছর বয়সী এই তরুণের মৃত্যু আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। আসাদের মৃত্যুর প্রতিবাদে ঢাকা উত্তাল হয়ে ওঠে। ছাত্রদের আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলনে।

রক্তমাখা শার্ট নিয়ে রাজপথে শোক মিছিল

আসাদের মৃত্যুর পরদিন তার রক্তমাখা শার্টকে সামনে রেখে ঢাকায় শোক মিছিল বের হয়। সেই মিছিলের সঙ্গে যুক্ত হয় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ।

মিছিলকারীদের সামনে তখন শুধু একজন তরুণের মৃত্যুর শোক ছিল না; ছিল সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ। রাজপথের সেই উত্তাল পরিস্থিতিতে আইয়ুব খানের নামে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা ও সড়কের নামও মানুষের প্রতিবাদের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

মোহাম্মদপুরের ‘আইয়ুব গেট’ও সেই প্রতিবাদের বাইরে থাকেনি। জনতার প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে গেটটির নাম বদলে হয়ে যায় ‘আসাদ গেট’।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে ‘আসাদ গেট’ করা হয়। একই সময় ‘আইয়ুব এভিনিউ’-এর নামও ‘আসাদ এভিনিউ’ করা হয়েছিল। আসাদের নাম তখন হয়ে ওঠে নিপীড়ন ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।

3

একটি নাম বদলের ভেতরে রাজনৈতিক বার্তা

কোনো স্থাপনার নাম পরিবর্তন সাধারণত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু আসাদ গেটের ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল ভিন্ন। এটি ছিল রাজপথের আন্দোলন থেকে উঠে আসা একটি প্রতীকী নাম পরিবর্তন।

যে গেটের নামকরণ হয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসকের নামে, কয়েক দিনের ব্যবধানেই সেটি হয়ে গেল সেই শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নিহত একজন ছাত্রনেতার স্মৃতিচিহ্ন।

ফলে ‘আসাদ গেট’ নামটি দ্রুত মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়ে। নামটি শুধু একটি স্থানকে নির্দেশ করত না; এটি হয়ে ওঠে আন্দোলন, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের পরিচয়।

আসাদের মৃত্যুর পর আরও তীব্র হয় গণঅভ্যুত্থান

আসাদের হত্যার প্রতিবাদে ২১ জানুয়ারি থেকে ঢাকায় বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ জানুয়ারি গণআন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। শ্রমিক, পেশাজীবী, সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হতে থাকেন।

ক্রমে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে। আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র হতে থাকে। এক পর্যায়ে আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে হয়।

আসাদ, শহীদ মতিউর রহমানসহ আন্দোলনে নিহতদের আত্মত্যাগ তখন গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে।

4

আইয়ুবের নাম মুছে আসাদের নাম

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় শুধু রাজনৈতিক দাবিই সামনে আসেনি; জনতার প্রতিবাদে বদলে যেতে থাকে শহরের নানা পরিচিতিও। পাকিস্তানি শাসকদের নামে থাকা কিছু স্থাননাম মানুষের কাছে হয়ে ওঠে ক্ষোভের প্রতীক।

সেই প্রেক্ষাপটে ‘আইয়ুব গেট’ থেকে ‘আসাদ গেট’ হয়ে ওঠার ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

একদিকে ছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসকের নাম, অন্যদিকে সেই শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে নিহত একজন তরুণ। গেটটির নতুন নাম যেন সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়।

আজও ইতিহাসের সাক্ষী

সময় বদলেছে। ঢাকার চেহারা বদলেছে। মোহাম্মদপুরের ব্যস্ততা বেড়েছে, বদলেছে আশপাশের সড়ক ও স্থাপনা। কিন্তু ‘আসাদ গেট’ নামটি টিকে আছে।

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই গেট দিয়ে চলাচল করেন। অনেকের কাছে এটি কেবল ঢাকার একটি পরিচিত স্থান। কিন্তু নামটির পেছনে রয়েছে এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন একজন তরুণের রক্ত রাজপথের আন্দোলনকে আরও বিস্ফোরিত করেছিল।

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে আসাদুজ্জামানের মৃত্যু এবং তার পরের দিনগুলোতে তাঁর নামকে ঘিরে যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তারই স্মারক হয়ে আছে ‘আসাদ গেট’।

এম/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর