জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৮২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা মেহেদী হাসানের তিনটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) লক করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি দুটি এনআইডিতে একই ছবি ব্যবহার করেছেন। অথচ দুটি এনআইডি নিবন্ধনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান দুই বছর।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ইসির এনআইডি অনুবিভাগের সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হওয়ার পরপরই মেহেদী হাসানের এনআইডিগুলো খুঁজে বের করে লক করা হয়েছে। মেহেদী হাসান প্রথম এনআইডি পেতে ২০০৮ সালে নিবন্ধন করেন। এরপর ২০২৪ সালে আবারও আবেদন করেন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে এনআইডি গ্রহণ করেন। সবশেষে ২০২৬ সালে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে তৃতীয় এনআইডি গ্রহণ করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ছবি এবং ২০২৬ সালের ছবি একই রকমের। তবে অন্যান্য তথ্য ভিন্ন। তাহলে প্রশ্ন আসে, একই ছবি ব্যবহার করে দুই বছর পর তিনি কীভাবে এনআইডি গ্রহণ করলেন? আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এখানে কারিগরি কাজের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। এ ঘটনায় কারিগরি দিকটি যাচাই করা প্রয়োজন।
তিনটি এনআইডি মেহেদী হাসান কীভাবে তৈরি করলেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসির এনআইডি অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে জানান, সংশ্লিষ্ট থানা নির্বাচন কার্যালয়ের ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের সহযোগিতায় এ ধরনের জালিয়াতি করা হয়ে থাকতে পারে।
তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, একটি নির্বাচন কার্যালয়ে একই সময়ে কয়েকজন ভোটার নিবন্ধনের জন্য এলে প্রতারক চক্রের সঙ্গে আগে থেকে যোগসাজশ করা ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কৌশলে অন্য কোনো ভোটারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেহেদী হাসানের তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিতে পারেন। অর্থাৎ, প্রকৃত ভোটারের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার পর সেটি তার নিজস্ব তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত না করে মেহেদী হাসানের সংরক্ষিত তথ্যে আপলোড করা হতে পারে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মিল পাওয়া গেলে বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই যাচাই প্রক্রিয়ায় চলে আসে। তবে ভোটার নির্বাচন কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার পর ছবি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য ভিন্ন পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট এনআইডি বাতিল বা খুলে দেওয়া হতে পারে। কারণ, অনেক সময় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মান খারাপ হলে তা অন্য ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্টের সঙ্গে ভুলবশত মিলে যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
আরও পড়ুন
এনআইডি আবেদনে জালিয়াতি ঠেকাতে স্বয়ংক্রিয় যাচাইয়ের উদ্যোগ
বড় প্রশ্নের মুখে ইসির তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা
মেহেদী হাসান ২০০৮ সালে প্রথম ভোটার হন। এরপর ২০২৪ ও ২০২৬ সালে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের মতো ভোটার হন। এখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় এনআইডিতে তিনি একই ছবি ব্যবহার করে ভোটার হয়েছেন। তাহলে দুই বছর পর একই ছবি ব্যবহার করে তৃতীয়বার তিনি কীভাবে ভোটার হলেন—জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ডেটাবেজে ছবি সংরক্ষণ করে রাখা বা ডেটাবেজের ছবি থেকে ছবি নিয়ে ভোটার করা সম্ভব নয়। কারণ আমরা যে ক্যামেরা ব্যবহার করি, তা ছবি তোলার সময় ভোটার জীবিত আছেন কি না, তা যাচাই করে তারপর ছবি তোলে। এ ক্ষেত্রে ক্যামেরা শরীর নড়াচড়া কিংবা চোখের পলক পড়ছে কি না, তা যাচাই করে। তবে যারা অন্ধ, তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ওই অপশন চালু করলে আমাদের ক্যামেরাও স্বাভাবিক ক্যামেরার মতো আচরণ করে। আর এ সুযোগের অপব্যবহার করে ছবি থেকে ছবি নিয়ে তিনি ভোটার হয়েছেন বলে আমার ধারণা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরবর্তী সময়ে জানাব।
জানা যায়, জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজের নিরাপত্তা ত্রুটিকে কাজে লাগিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনটি এনআইডি গ্রহণ করে সিটি ব্যাংক পিএলসির প্রায় ৮২ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মেহেদী হাসান ও তার তৈরি চক্র। এনআইডি জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসার পর ঋণ নিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে সিটি ব্যাংক।
গত ২৭ জুলাই ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে ব্যাংকটির এভিপি ও সিনিয়র ম্যানেজার শহিদ-উল-হক মামলার আবেদন করেন। মামলায় ঋণ সুবিধা নেওয়া মো. মেহেদী হাসানকে প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া ঋণের গ্যারান্টর মো. রফিকুল ইসলাম ও কাজী রাশেদুর রহমানসহ নির্বাচন কমিশনের অজ্ঞাতনামা অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আসামি করা হয়।
পরে আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে অভিযোগটি উত্তরা পশ্চিম থানায় এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সিআইডি নির্বাচন কমিশনের কাছে মেহেদী হাসানের এনআইডির তথ্য চেয়েছে।
এমএইচএইচ/জেবি




