এক যুগ পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার

ভাবি-দেবরের অনৈতিক সম্পর্ক দেখে ফেলাই কাল হয় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫ আগস্ট ২০২২, ০৫:০৪ পিএম
ভাবি-দেবরের অনৈতিক সম্পর্ক দেখে ফেলাই কাল হয় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ছাড়াও তিন বছরের সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর এক যুগ ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন জাকির হোসেন (৪৭)। তবে শেষরক্ষা হয়নি। মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচতে দীর্ঘ এই সময়ে নানা ছদ্মবেশ নিলেও অবশেষে র‌্যাবের হাত গ্রেফতার হয়েছেন জাকির।

শুক্রবার (৫ আগস্ট) দুপুরে কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন র‌্যাব-৪ এর সিও ডিআইজি মোজাম্মেল হক।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) ভোররাতে ঢাকার সাভার উপজেলার শাহিবাগ এলাকা থেকে জাকিরকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদস্যর।

সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি মোজাম্মেল হক জানান, ১২ বছর আগে দৌলতপুরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নিপা আক্তার (২২) ছাড়াও তিন বছর বয়সী মেয়ে জোতিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন জাকির হোসেন। এরপর দীর্ঘসময় ধরে আত্মগোপনে ছিলেন। এরই মধ্যে হত্যার মামলায় তার মৃত্যুদণ্ডও দেন আদালত।

হত্যার কারণ জানাতে গিয়ে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, জাকির মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থানার জিয়নপুরের বাসিন্দা। একই গ্রামের মো. আবু হানিফের মেয়ে নিপা আক্তারের সঙ্গে ২০০০ সালে তার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল। তবে বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে জাকিরের পরিবারকে নগদ অর্থ ও গহনা ছাড়াও আসবাবপত্র দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে অধিক পরিমাণে যৌতুকের লোভে নানা সময়ে স্ত্রী নিপাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে জাকির।

Arrest

যৌতুক নিয়ে এমন দাম্পত্য কলহের জেরে জাকির ও নিপার ঘরে তাদের প্রথম মেয়ে জোতির জন্ম হয়। পরবর্তীকালে মেয়ে জোতির বয়স যখন তিন বছর চলছিল নিপা তখন পুনরায় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। আর সেই সময়েই নিজের ভাবির সঙ্গে জাকিরের পরকীয়ার কথা জানতে পারেন নিপা। পরে বিষয়টি নিয়ে তাদের দাম্পত্য কলহ আরও বেড়ে যায়।

পরবর্তীকালে ২০০৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে জাকিরের ভাই বাড়িতে না থাকার সুযোগে সে তার ভাবির ঘরে প্রবেশ করে। ওই সময় জাকিরের স্ত্রী নিপাও বিষয়টি খেয়াল করেন এবং একপর্যায়ে ভাবি-দেবরকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেন। পরে ঘটনাটি ভাসুরকে বলে দেবন জানালে জাকির ও নিপার মধ্যে তুমুল ঝগড়া-বিবাদদের সৃষ্টি হয়। এ সময় নিপাকে তালাক দেবে বলেও জাকির ভয়-ভীতি দেখায়।

একপর্যায়ে বিষয়টি সে সময় দমে গেলেও নিপা যখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা তখন পারিবারিক বিরোধের মাঝে সে জাকিরের বড় ভাই, শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের সদস্যদের পরকীয়ার বিষয়টি জানায়। তবে সে সময় ওই কথা বিশ্বাস না করেই ক্ষিপ্ত হয়ে নিপাকে সবাই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। পরে বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্য ছাড়াও আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের উস্কানিতে স্ত্রী নিপার প্রতি আরও উগ্র এবং প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে জাকির। একপর্যায়ে সে নিপাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

Arrest

এরপর ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘুমন্ত স্ত্রী নিপাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করে। ওই সময় মৃত্যু যন্ত্রণায় হাত-পা নাড়াচাড়া করার সময় তাদের তিন বছরের মেয়ে জোতি জেগে কান্না শুরু করে। পরে ঘটনার সাক্ষী না রাখতে জাকির স্ত্রী নিপার মতো একইভাবে শিশু জোতিকেও হত্যা করে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পরদিন পুলিশ নিপা ও তার মেয়র লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠায়। পরে ওই ঘটনায় নিপার বাবা বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন। একপর্যায়ে আদালত দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটির শুনানি করে পরবর্তীকালে জাকিরের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।

জাকিরের গ্রেফতার প্রসঙ্গে র‌্যাব-৪ এর সিও ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার ঘটনায় কয়েক বছর হাজতবাস শেষে জামিন নিয়ে বের হয়েই কৌশলে জাকির আত্মগোপনে চলে যান। এরপর ২০১৩ সালে সে পুনরায় বিয়ে করে। গ্রেফতারের আগ মুহূর্তেও সে তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সাভারের জিনজিরা এলাকায় বসবাস করে আসছিল। বর্তমান তার সংসারে মাধুরি (৫) ও মারিয়া (৩) নামে দুইটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

তবে প্রথম স্ত্রী নিপা ও মেয়ে জ্যোতিকে হত্যা মামলায় জামিন নেওয়ার পর ২০১০ সাল থেকে সে আর কোনোদিন মানিকগঞ্জের দৌলতপুর যায়নি। আর এই সময়ে সে গ্রেফতার এড়াতে চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকার আরামবাগ, ফকিরাপুল, হাজারীবাগ, খিলগাঁও ও সাভার এলাকায় বসবাস করতো। তবে এক জায়গায় সে বেশিদিন অবস্থান করত না। তাছাড়া পরিচয় গোপনের উদ্দেশ্যে সে প্রতিনিয়ত পেশা পরিবর্তন করত। কখনো গার্মেন্টস, স্পাইরাল বাইন্ডিং, ঝুট ব্যবসা আবার কখনো ছদ্মবেশ ধারণ করে বিভিন্ন বাউল গানের দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত।

এমআইকে/আইএইচ