সিগারেটের বিভিন্ন মূল্যস্তরের মধ্যে দামের ব্যবধান বাড়ায় দেশে ধূমপান হার কমার পরিবর্তে ভোক্তাদের ‘ডাউনট্রেডিং’ এর প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম তুলনামূলক কম থাকায় বেশি দামের সিগারেটের ভোক্তাদের অনেকেই কম দামের সিগারেটে চলে যাচ্ছেন। এতে একদিকে তামাকের ব্যবহার কমানোর লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারও প্রত্যাশিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সব স্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানো হলেও উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম নিম্নস্তরের তুলনায় অনেক বেশি হারে বাড়ানো হয়েছে। নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বিপরীতে মধ্যম স্তরে ১৫ শতাংশ, উচ্চস্তরে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং প্রিমিয়াম স্তরে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে।
সিগারেটের বিভিন্ন মূল্যস্তরের মধ্যে সামঞ্জস্যহীন কর কাঠামো কার্যকর হওয়ার ফলে উচ্চমূল্যের সিগারেটের ভোক্তাদের একটি অংশ কম দামের সিগারেটে চলে যাচ্ছেন। এতে ধূমপানের হার অপরিবর্তিত থাকলেও সরকারের প্রতি শলাকায় কর আদায়ের পরিমাণ কমছে। এ প্রবণতায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে যেমন ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারাও বলছেন, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর তুলনামূলক দামি সিগারেটের বিক্রি কমেছে। বিপরীতে কম দামের সিগারেটের বিক্রি বেড়েছে। গুলশান-১ এলাকার এক খুচরা বিক্রেতা জানান, আগে যে পরিমাণ দামি সিগারেট বিক্রি হতো, এখন তার চেয়ে কম বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক সস্তা সিগারেটের চাহিদা বেড়েছে।
একই এলাকার একজন ধূমপায়ী বলেন, দাম বাড়ার কারণে তিনি আগের ব্র্যান্ড ছেড়ে কম দামের সিগারেট কিনছেন। তাঁর ভাষায়, দামি সিগারেটের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের ব্র্যান্ড কেনা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্তর নির্ধারণে নিম্ন ও উচ্চমূল্যের সিগারেটের দামের ব্যবধান বিবেচনায় না নিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বরং উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম তুলনামূলক বেশি বাড়িয়ে নিম্নস্তরের সিগারেটকে কম দামের মধ্যে রাখায় ‘ডাউনট্রেডিং’ অর্থাৎ দামি ব্র্যান্ড ছেড়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা ব্র্যান্ডে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
বাজেটে সিগারেটের মূল্যস্তরে পরিবর্তনের প্রভাবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরের জুলাইয়ে সিগারেট খাত থেকে ৩ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরের একই মাসে আদায় হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে এ খাতের রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বা ৪৫ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, সিগারেট থেকে সরকারের রাজস্ব প্রত্যাশা অনুযায়ী না আসার অন্যতম কারণ হতে পারে সিগারেটের বিভিন্ন স্তরের দামের পরিবর্তনের প্রভাব। উচ্চস্তরের ব্র্যান্ডের দাম তুলনামূলক বেশি বেড়েছে, অন্যদিকে নিম্নস্তরের ব্র্যান্ডের দাম তুলনামূলক কম বেড়েছে। ফলে স্থির আয়ের ভোক্তারা উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ড থেকে কম দামের ব্র্যান্ডে চলে যেতে পারেন। আগে যারা উচ্চস্তরের ব্র্যান্ডের সিগারেট কিনতেন, তারা এখন তুলনামূলক কম দামের নিম্নস্তরের ব্র্যান্ড বেছে নিচ্ছেন। এর ফলেও সরকারের সিগারেট খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব কমতে পারে।
ফ্লোর প্রাইস পরিবর্তনের কারণে নিম্নস্তরের সিগারেটের ভোক্তা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আগেও দেখা গেছে। এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের সিগারেটের গড় মূল্য প্রতি ১০ শলাকায় ১২৮ টাকা বেড়েছে। একই সময়ে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের সিগারেটের গড় মূল্য বেড়েছে মাত্র ৫৬ টাকা। অর্থাৎ নিম্নস্তরের তুলনায় উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় দ্বিগুণ।
দামের এই ব্যবধানের প্রভাব সিগারেটের বাজারেও দেখা গেছে। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট সিগারেটের বাজারে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তর অর্থাৎ তুলনামূলক কম দামের সিগারেটের অংশ ছিল ৮০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ে ভোক্তাদের বড় একটি অংশ তুলনামূলক কম দামের স্তরের দিকে সরে গেছে।
এর অর্থ সিগারেটের দাম বাড়ানোর এ ধরনের অযৌক্তিক নীতি ধূমপান কমানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না। কারণ উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম বাড়লে ভোক্তারা কম দামের স্তরে চলে গেলে মোট সিগারেটের ব্যবহার সার্বিকভাবে না কমে সরকারের রাজস্ব কমে যায়। জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও কোনো উন্নতি হয় না। সিগারেট খাত সরকারের রাজস্বের অন্যতম বড় উৎস হওয়ায় এ খাতে আদায় কমে গেলে সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সিগারেট খাতের রাজস্ব প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য সেই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তামাকের ব্যবহার কমানো এবং রাজস্ব আদায় – দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে সিগারেটের কর ও মূল্য কাঠামো নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শুধু উচ্চমূল্যের সিগারেটের দাম বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বরং নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দামের ব্যবধান কমাতে হবে।
তাই সিগারেটের বর্তমান মূল্যস্তর ও কর কাঠামো পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম তুলনামূলক কম রেখে উচ্চস্তরের সিগারেটের দাম বাড়ানোর বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব দুই ক্ষেত্রেই সরকারের নীতির কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।
এসটি/




