আগাম টিকিট সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিবিজড়িত জাদুঘর পরিদর্শনে এসে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দর্শনার্থীরা।
অভিযোগ, আজ সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য আগে থেকেই অনলাইনে টিকিট বিক্রি করা হলেও কোনো কার্যকর পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ জাদুঘর বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে একটি নোটিশ ঝুলিয়ে কর্তৃপক্ষ দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জাদুঘরের প্রধান ফটক বন্ধ রয়েছে। ফটকের সামনে টাঙানো একটি নোটিশে জাদুঘর বন্ধ থাকার বিষয়টি জানানো হয়েছে।
তবে আগে থেকে অনলাইনে টিকিট সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না। ফলে শিশু ও পরিবার-পরিজন নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের জাদুঘরের সামনে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়।
যশোর, কুমিল্লা, পাবনা, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিশু ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই সকাল থেকেই জাদুঘরের সামনে এসে ভোগান্তিতে পড়েন। তাদের অভিযোগ, অনলাইনে টিকিটে স্পষ্টভাবে ২৬ আগস্ট ২০২৬ ‘ডেট অব ভিজিট’ উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সেখানে এসে তারা জাদুঘর বন্ধ দেখতে পান।
দর্শনার্থীদের অভিযোগ, হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে জাদুঘর বন্ধ করার পর শুধু নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। বিশেষ করে আগে থেকে নির্দিষ্ট তারিখের টিকিট বিক্রি করার পর এমন সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষের চরম সমন্বয়হীনতা বলেও মনে করছেন তারা।
তাদের দাবি, জাদুঘর বন্ধের প্রকৃত কারণ দ্রুত জানাতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন আগাম টিকিট সংগ্রহ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের এমন ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
যশোর থেকে পরিবার নিয়ে আসা মানিক হোসেন বলেন, ‘গতকাল ট্রেনের টিকিট কেটে হোটেলে থেকেছি। বাচ্চাদের স্কুলে স্বাভাবিকভাবে ছুটি পাওয়া যায় না। ছুটি পেয়ে তাদের নিয়ে আসলাম। আগে থেকেই অনলাইনে টিকিট কেটে রেখেছিলাম। কিন্তু আজ এসে দেখি কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া জাদুঘর বন্ধ। বন্ধ রাখতেই পারে, কিন্তু আগে অনলাইনে জানালে আমরা এত দূর থেকে আসতাম না।’
তিনি বলেন, ‘টিকিট বিক্রি করার পর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া খুবই কষ্টদায়ক। আমরা দুই পরিবার বাচ্চাদের নিয়ে এসেছি। ওরা টেলিভিশনে দেখে এই জায়গা সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। সেই আগ্রহ নিয়ে এত দূর থেকে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে আসা সাইফুদ্দিন বলেন, ‘আমি জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত এই জাদুঘর দেখতে এসেছি। সরকারি ছুটির দিনে সাধারণ মানুষ, চাকরিজীবী ও তাদের পরিবার নিয়ে এখানে আসবে, এটাই স্বাভাবিক। অথচ হঠাৎ করে বন্ধ। টিকিট বিক্রি করা হয়েছে, তারপরও কেন বন্ধ, সেটাই আমাদের প্রশ্ন।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এভাবে নোটিশ ঝুলিয়ে দায় এড়ানো যায় না। কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কার নির্দেশে হলো, তা খতিয়ে দেখা দরকার।’
দূর-দূরান্ত থেকে ছেলে মেয়েদের নিয়ে আসা জোসনা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের নিয়ে অনেক আশা করে এসেছি। যাতায়াতে টাকা খরচ হয়েছে, শারীরিক ও মানসিকভাবে ভোগান্তি হয়েছে। এখন এসে দেখি বন্ধ। টিকিটও বিক্রি করেছে। তাহলে আগে জানানো হলো না কেন? মানুষ এত দূর থেকে এসে কেন ঘুরে যাবে?’
আরেক দর্শনার্থী নুরজাহান নাহার বলেন, ‘ছুটির দিনে তো দর্শনার্থীর চাপ বেশি থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমরা আগে থেকে টিকিট কেটে পরিকল্পনা করে এসেছি। হঠাৎ এসে বন্ধ পাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। কর্তৃপক্ষ যদি আগে ঘোষণা দিত যে আজ বন্ধ থাকবে, তাহলে আমরা অন্যদিন আসতাম।’
এদিকে সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘অবিশ্বাস্য ব্যবস্থাপনা! এই জাদুঘরটা যে কীভাবে চলছে, এটা একমাত্র খোদা জানেন। কোনো কর্মী নেই। মন্ত্রণালয় নির্বিকার। তারপর যাদের কলিজায় কষ্ট হয়, তারা কয়েকজন মিলে স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় করে দিয়েছে। না হলে এতদিনে হয়তো জাদুঘরটাই শেষ হয়ে যেত।’
তিনি আরও বলেন, ‘এদিকে মন্ত্রণালয় হুট করে তিনজন আমলাকে পাঠিয়েছে, যাদের এই জাদুঘর সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। একটা সামান্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীও নিয়োগ দেওয়া হয়নি, যদিও পাঁচ মাস সময় হাতে পেয়েছে। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অবিলম্বে এই বিষয়ে খোঁজখবর করা দরকার।’
জাদুঘরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘একটা প্রায় তৈরি জিনিসের ব্যবস্থাপনা করতে যদি এই লেজেগোবরে অবস্থা হয়, তাহলে সরকারের বড় বড় পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে? এই জাদুঘরটি যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা দেখা সত্যিই হৃদয়বিদারক।’
এএইচ/এএইচ



