তামাকজাত দ্রব্যের ওপর কর বাড়ালে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং সুনির্দিষ্ট করারোপের মাধ্যমে তামাকের কর বাড়িয়ে একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার তামাক কর বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে বলে মত দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ‘অ্যাডভান্সিং টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি অ্যান্ড প্রাইস মেজারস: লেসনস ফ্রম শ্রীলঙ্কা’ শীর্ষক এক যৌথ ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো, বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি এবং শ্রীলঙ্কার টেক টার্ন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
ওয়েবিনারে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ। মূল বক্তব্য দেন শ্রীলঙ্কার ভেরিতে রিসার্চের প্রধান অর্থনীতিবিদ রাজ প্রভু রাজাকুলেন্দ্রন এবং টেক টার্ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক আসিথা ধর্শনা ফনসেকা। আলোচনায় অংশ নেন ভেরিতে রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক ড. নিশান দে মেল, টেক টার্ন ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম পরিচালক সামিরা লাকমাল এবং ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর গবেষণা সহযোগী ইশরাত জাহান ঐশী।
রাজ প্রভু রাজাকুলেন্দ্রন বলেন, শ্রীলঙ্কায় সিগারেটের ওপর আরোপিত করের বড় অংশই সিগারেটের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে আলাদাভাবে মূল্য সংযোজন করও আরোপ করা হয়। এর ফলে সরকার সিগারেটের খুচরা মূল্য ও কর আদায়ের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কর কাঠামো মূলত মূল্যভিত্তিক। এতে সিগারেটের ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে উৎপাদকদের প্রভাব থাকে। রাজস্ব বাড়াতে বাংলাদেশেও মূল্যভিত্তিক করের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট করারোপ চালু করা যেতে পারে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাজ প্রভু রাজাকুলেন্দ্রন বলেন, আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুনির্দিষ্ট কর নিয়মিত সমন্বয় করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার মতো স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। আবার নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেও কর সমন্বয় করা সম্ভব।
তামাকের কর বাড়ালে রাজস্ব কমে যাওয়ার ধারণার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কায় সুনির্দিষ্ট করারোপের ফলে সিগারেটের ওপর কর প্রায় ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। একই সময়ে সরকারের তামাক কর থেকে রাজস্ব প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ কর বাড়ানোর পরও রাজস্ব কমেনি, বরং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাসিরুদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের মোট রাজস্বের প্রায় ১০ শতাংশ তামাক খাত থেকে আসে। ফলে কর ব্যবস্থায় এ খাতের গুরুত্ব অনেক। তবে দেশের তামাক কর ব্যবস্থায় বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সিগারেটের চারটি স্তর, বিড়ির দুটি স্তর এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্যের কর কাঠামোতে সমস্যা রয়েছে। মূল্যভিত্তিক কর ব্যবস্থাও ত্রুটিপূর্ণ। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের দুর্বলতাও রয়েছে। এসব কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সমস্যা মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কার সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতে পারে।
ভেরিতে রিসার্চের নির্বাহী পরিচালক ড. নিশান দে মেল বলেন, তামাকের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো ছাড়া ব্যবহার কমানো কঠিন। সিগারেটের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু কোম্পানির নির্ধারিত মূল্যের ওপর নির্ভর না করে কর কাঠামোর মাধ্যমে মূল্য বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি সুনির্দিষ্ট করের একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক নির্ধারণের পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রতি সিগারেটে ১৫ টাকা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যভিত্তিক করও বহাল রাখা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুনির্দিষ্ট কর চালুর সময় বিদ্যমান অন্য কোনো কর ব্যবস্থা বাতিল করা যাবে না।
ড. নিশান দে মেল বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো অনেক সময় বিদ্যমান শতাংশ ভিত্তিক করের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট কর চালুর প্রস্তাব দিতে পারে। এক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। সুনির্দিষ্ট করকে বিদ্যমান করের বিকল্প না করে অতিরিক্ত কর হিসেবে যুক্ত করা হলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
টেক টার্ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক আসিথা ধর্শনা ফনসেকা বলেন, তামাকের ওপর কর বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর অন্যান্য পণ্যের কর বাড়ানোর চাপ কমানো সম্ভব। তামাক থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায় করে তা জনস্বাস্থ্য খাতেও ব্যয় করা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হবে।
টেক টার্ন ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম পরিচালক সামিরা লাকমাল বলেন, শ্রীলঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের কিছু অংশ বিভিন্ন সময়ে তামাক কোম্পানির বক্তব্যকে জোরালো করেছে। বাংলাদেশকেও তামাক কর নীতিতে কোম্পানিগুলোর হস্তক্ষেপের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। জনস্বাস্থ্য ও রাজস্ব বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়ে করনীতি প্রণয়ন করতে হবে।
ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিসের বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বলেন, বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট করারোপের ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা কীভাবে গবেষণাভিত্তিক তথ্য তৈরি করেছে এবং তা নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করেছে, সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশেও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সরকারের রাজস্ব বাড়াতে মূল্যভিত্তিক করের পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যে সুনির্দিষ্ট কর চালু করা প্রয়োজন।
ওয়েবিনারে বক্তারা জানান, বাংলাদেশে সিগারেটের ওপর করের হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও তামাকজাত দ্রব্যের সহজলভ্যতা এখনো উদ্বেগজনক। সিগারেটের কর কাঠামো আরও কার্যকর করা গেলে একদিকে তামাকের ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্বও বাড়ানো যাবে। এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার করনীতি থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ওয়েবিনারে সমাপনী বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হলেও তা বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে এবং শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, তাহলে এই লক্ষ্য অর্জনের পথ সহজ হবে।
ওয়েবিনারে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, তামাক নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রায় ৭০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
এএইচ/এফএ




