নেত্রকোনার মদনে মাদরাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ মাহমুদী সাগরের বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে সম্প্রতি সিআইডির ডিএনএ প্রতিবেদনে ৯৯.৯৯% মিল পাওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিশুটির পক্ষে প্রথম সোচ্চার হওয়া ডাক্তার সায়মার পরিবার এবার মুখ খুলেছেন।
ডিএনএ প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ডাক্তার সায়মার স্বামী মোহাম্মদ আসিফুল ইসলাম ‘ঢাকা মেইল’-এর সঙ্গে ফোনালাপে তাদের ওপর হওয়া মানসিক ট্রমা এবং সামাজিক নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন।
প্রমাণ পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া
ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়ার পর আসিফুল ইসলাম বলেন, যারা এতদিন প্রমাণ চেয়েছিল, তারা প্রমাণ পেয়েছে। কিন্তু প্রমাণ পাওয়ার পরও কিছু মানুষের রিঅ্যাকশন এমন ছিল যেন ‘রিপোর্ট কি চেঞ্জ করা যায় না?’ বা ‘রিপোর্ট আসতে এতদিন লাগে কেন?’ আমার একটাই কথা— মূর্খকে আপনি যতই বোঝানোর চেষ্টা করেন, তাকে জ্ঞানী বানাতে পারবেন না। তারা অন্ধ, তাদের চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও তারা সত্য দেখতে পাবে না।
সাইবার বুলিং ও মারাত্মক হুমকির অভিজ্ঞতা
ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনার পর থেকে সায়মা ও তার পরিবার চরম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানান আসিফুল। তিনি অভিযোগ করেন, ডা. সায়মাকে গণধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে, এমনকি ‘আলেম বিদ্বেষী’ ও ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ ট্যাগ দেওয়া হয়েছে।
আসিফুল বলেন, আমাদের প্রতি অনবরত চাপ ছিল যেন আমরা অনলাইনে এসে ক্ষমা চাই। কিন্তু আমরা তো কাউকে দোষারোপ করিনি; ভিকটিমের কাছ থেকে যা শুনেছি, কেবল সত্য ঘটনাটাই মিডিয়ার সামনে তুলে ধরেছিলাম।
চিকিৎসক সমাজ থেকেও ট্রল
দুঃখ প্রকাশ করে আসিফুল জানান, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ডক্টর কমিউনিটির অনেকে তাদের সহযোগিতা করার বদলে উল্টো ট্রল করেছেন। তিনি বলেন, ডাক্তার শেখ সোহাগ নামের একজন ডক্টর গতকালও সায়মার পোস্টে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, সায়মা নাকি ৩৩ হাজার ফলোয়ার পাওয়ার জন্য এসব করেছে! অথচ যিনি নীতি-নৈতিকতার কথা বলছেন, তিনি নিজেই নিজের পেইজে রোগীর উন্মুক্ত পিঠের ছবি পোস্ট করে নিয়ম লঙ্ঘন করছেন।
মানসিক ট্রমা ও চিকিৎসকের পরামর্শ
টানা ট্রল ও অনলাইন নিপীড়নের কারণে ডাক্তার সায়মা গভীর মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছেন। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন ছিল যে, প্রায় ৭ থেকে ১০ দিন তিনি বাসা থেকে বের হতে পারেননি এবং নিজের কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরবর্তীতে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের (মনস্তাত্ত্বিক) পরামর্শ ও চিকিৎসায় তিনি ধীরে ধীরে ফের কাজে ফেরেন।
অপরাধের বিচারের প্রত্যাশা
ময়মনসিংহের নিজের এলাকার একটি অন্যায়ের উদাহরণ টেনে আসিফুল ইসলাম বলেন, "আমাদের সমাজে প্রায়ই ৫-১০ হাজার টাকায় এমন অপরাধ ধামাচাপা পড়ে যায়। আমরা সোচ্চার না হলে অপরাধীরা এভাবেই পার পেয়ে যাবে। আমাদের চাওয়া কেবল একটাই— আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটি সুন্দর, সুস্থ ও ন্যায়বিচার সমৃদ্ধ বাংলাদেশে নিরাপদে বাঁচতে পারে।
উল্লেখ্য, চার বছর আগে মদনে প্রতিষ্ঠিত একটি মহিলা কওমি মাদরাসায় পড়তে গিয়ে শিক্ষক আমানুল্লাহ সাগর কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। গত ১৮ এপ্রিল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা ধরা পড়লে ২৩ এপ্রিল তার মা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে গত ৬ মে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে অভিযুক্ত শিক্ষক সাগরকে গ্রেফতার করে র্যাব-১৪।
আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে সিলেটের সেফ হোমে পাঠানো হলে সেখানে গত ২ জুলাই সে এক কন্যাশিশুর জন্ম দেয়। ২৯ জুলাই নবজাতক ও আসামির নমুনা সংগ্রহের পর ফরেনসিক পরীক্ষায় তা হুবহু মিলে যায়।
ইএইচ/এফএ




