সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘমেয়াদে আটক বন্ধের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজনৈতিক বিরোধীদের দীর্ঘমেয়াদে আটক বন্ধের আহ্বান
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের অনির্দিষ্টকাল ধরে প্রাক-বিচার আটক (প্রি-টায়াল ডিটেনশন) রাখার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

রোববার (২৩ আগস্ট) লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এই আহ্বান জানায়।

বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, পদচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে যুক্ত রাজনীতিবিদ ও অন্যদের দীর্ঘায়িত আটকাদেশ অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
২০২৪ সালের আগস্টে গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করার পর পুলিশ, আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে আটক করে। এদের মধ্যে শত শত মানুষকে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই কারাগারে রাখা হয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, যদিও পূর্ববর্তী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনে কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, তবে অনেককে কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়েছে। কারাবন্দিদের পরিবার ও আইনজীবীদের অভিযোগ, অসুস্থ ও বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও অনেককে জামিন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

এইচআরডব্লিউ-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারে মারা গেছেন, যাদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধেই কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ইলেইন পেয়ারসন বিবৃতিতে বলেন, ‘পর পর কয়েকটি সরকারের আমলে কোনো প্রমাণ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত বিরোধীদলীয় সদস্যকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; তাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত রাজনৈতিক বিরোধীদের এই দীর্ঘায়িত ও স্বেচ্ছাচারী আটক বন্ধ করা।’

বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, প্রস্তাবিত নতুন 'জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল' বর্তমান রূপে গৃহীত হলে তা বেআইনি গ্রেফতার তদন্তে নতুন কমিশনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এইচআরডব্লিউ জানায়, আটকদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মী ও সাবেক আইন প্রণেতারা রয়েছেন। কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

এইচআরডব্লিউ অভিযোগ করেছে, যেসব মামলায় কোনো প্রমাণ নেই, সেখানেও প্রসিকিউটররা বারবার জামিনের বিরোধিতা করছেন। আদালত জামিন দিলেও নতুন মামলা দায়ের করে বন্দিদের মুক্তি আটকে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

দৃষ্টান্ত হিসেবে সংস্থাটি সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের (৮২) প্রসঙ্গ টেনেছে। তাকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, কারাগারে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চে হাইকোর্ট জামিন দিলেও পুলিশ নতুন মামলা দিয়ে তার মুক্তি আটকে দেয়। শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগের হস্তক্ষেপে গত ১৯ আগস্ট তিনি মুক্তি পান। এই পুরো সময়ে তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক চার্জশিট গঠন করা হয়নি।

একই চিত্র দেখা গেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও। ট্রাইব্যুনালে ১৬০ জনের বেশি মানুষ আটক থাকলেও কাউকেই জামিন দেওয়া হয়নি।

সাবেক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী (৮১) ২২ মাস ধরে অভিযোগ ছাড়াই বন্দি রয়েছেন। একইভাবে সাবেক সংসদ সদস্য কামাল আহমেদ মজুমদার (৭৫) গুরুতর অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও তার জামিন আবেদন নাকচ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, আটক অনেক প্রবীণ নেতা গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। এদের মধ্যে শাহরিয়ার কবির (৭৫) এবং আর এ এম ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর (৭১) নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে এইচআরডব্লিউ জানায়, সাবেক সংসদ সদস্য রমেশ চন্দ্র সেন (৮৫) এবং জামালপুরের আওয়ামী লীগ নেতা এস এম জিয়াউল হক জিয়া সঠিক চিকিৎসা ও জামিন না পেয়ে কারাগারেই মারা গেছেন।

সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রাক-বিচার আটক একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা হওয়া উচিত, নিয়ম নয়। কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা নির্দেশতার পূর্বানুমান এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী।

ইলেইন পেয়ারসন বলেন, ‘যে বিচার ব্যবস্থা অভিযোগ গঠনের আগেই বৃদ্ধ মানুষকে হেফাজতে মারা যেতে দেয়, তা স্পষ্টতই মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। সরকারের উচিত নজরদারিতে থাকা জেলের প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং অভিযোগহীন দীর্ঘকালীন স্বেচ্ছাচারী আটক বন্ধ করা।’

আরএনবি/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর