সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

কোস্ট গার্ডের হেফাজত থেকে নিখোঁজ মিরাজ, উদ্ধারের দাবি পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

শেয়ার করুন:

কোস্ট গার্ডের হেফাজত থেকে নিখোঁজ মিরাজ, উদ্ধারের দাবি পরিবারের
জাতীয় প্রেস ক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন। ছবি: ঢাকা মেইল

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার জয়মনি এলাকার নিখোঁজ জেলে মিরাজ শেখকে দ্রুত উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে তার পরিবার।

শনিবার (২৪ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মিরাজকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় খুঁজে বের করার পাশাপাশি নিখোঁজের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিরাজ শেখ পেশায় মোটরসাইকেল ভাড়া চালক ও জেলে। গত ১০ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে জয়মনি হাটের আল আমিনের চায়ের দোকান থেকে দুই ব্যক্তি সাদা পোশাকধারী কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয়ে তাকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ গজ দূরে অবস্থিত কোস্ট গার্ডের হারবারিয়া ফোর্স গার্ড স্টেশনের পন্টুনে নিয়ে যায়। পরে মোংলা দিক থেকে একটি কোস্ট গার্ড স্পিডবোট সেখানে আসে।

পরিবারের দাবি, স্পিডবোটে ৭-৮ জন ইউনিফর্ম পরিহিত সদস্য ছিলেন। তারা পন্টুনে উঠে মিরাজ শেখের সঙ্গে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন এবং পরে তাকে স্পিডবোটে নিয়ে চলে যান। ঘটনাটি উপস্থিত গ্রামবাসীসহ মিরাজের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরা প্রত্যক্ষ করেন। মিরাজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কোস্ট গার্ড সদস্যরা স্থানীয় দোকানদার আল আমিনের জিম্মায় রেখে যান।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, প্রায় ১১ দিন পর গভীর রাতে মিজান মাহমুদসহ দুই কোস্ট গার্ড সদস্য পন্টুন থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। তাদের একজনের নাম রবিন বলে পরিবার জানতে পারে। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানা ও বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করা হয়। গত ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১১৮৪) করা হয়।

পরিবারের দাবি, ১০, ১১ ও ১২ এপ্রিল পন্টুনে কোস্ট গার্ডের এক সদস্যের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার কথা হয়। ওই সদস্য স্বীকার করেন যে মিরাজ তাদের হেফাজতে রয়েছেন। তাকে ২-৩ দিনের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোস্ট গার্ড সদস্যরা মিরাজকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

মিরাজের স্ত্রী দিপারাজ কোস্ট গার্ডের কাছে গেলে তাকে ‘উকিল’ নামে এক সদস্যের মাধ্যমে জানানো হয়, মিরাজকে নিয়ে অভিযানে যাওয়া হবে এবং বিকেল ৪টার দিকে তাকে দেখানো হবে। কিন্তু পরে বিকেল ৪টায় ‘শাহীন’ নামের এক কোস্ট গার্ড সদস্য আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন বলে পরিবারের অভিযোগ।

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে মিরাজের সন্ধান না পেয়ে পরিবারটি মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি, কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে যোগাযোগ, সংবাদ সম্মেলন এবং সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেছে বলে জানানো হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত ১২ জুলাই ২০২৬ হাইকোর্ট কোস্ট গার্ডকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন। তবে কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে এবং এখনো মিরাজের কোনো সন্ধান মেলেনি বলে পরিবারের অভিযোগ।

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, মিরাজের সন্ধানের দাবিতে আয়োজিত একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ব্যানার কেড়ে নেওয়া এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়েছে। পরে মিরাজকে ফেরত ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবিতে পরিবার ও গ্রামবাসী পন্টুনে গেলে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তাদের ওপর লাঠিচার্জ করেন বলেও অভিযোগ করা হয়। এতে কয়েকজন গ্রামবাসী আহত হন এবং মিরাজের মা, বোন ও স্ত্রীকে আটক করা হয় বলে পরিবারের দাবি। এ ঘটনায় মিরাজের পরিবারসহ ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা প্রায় ৩০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

পরিবারের সংগৃহীত তথ্যের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সংঘটিত প্রথম দিকের ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি একটি, যেখানে কোস্ট গার্ডের মাধ্যমে মিরাজ শেখকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সর্বশেষ তাকে কোস্ট গার্ডের হেফাজতেই দেখা গিয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলন থেকে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সাত দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মিরাজ শেখকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে আদালতে হাজির করা, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনে প্রকাশ্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাকে আদালতে সোপর্দ করা, কোনো ধরনের বিনা বিচারে আটক বা নির্যাতন না করা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত কোস্ট গার্ড সদস্যদের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং মিরাজের পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এ ছাড়া কাউকে আটকের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ এবং আটকের কারণসহ পরিবারের সদস্য বা আত্মীয়কে অবহিত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। গুম প্রতিরোধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মিরাজের সাত বছরের শিশু তার বাবার পথ চেয়ে আছে। পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে প্রিয়জনের ফিরে আসার আশায়। দ্রুত মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এম/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর