রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

নির্বাচনি চক্রের প্রতিটি ধাপে নারীর অর্ধেক অংশীদারত্ব চায় ইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

নির্বাচনি চক্রের প্রতিটি ধাপে নারীর অর্ধেক অংশীদারত্ব চায় ইসি

নির্বাচনি চক্রের প্রতিটি ধাপে নারীর অর্ধেক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেছেন, ভোটার, জনগণ, রাজনৈতিক দল, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ— সব পর্যায়েই নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বিদ্যমান বৈষম্য কমানো সম্ভব।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে ইউএনউইমেন ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ আয়োজনে ‘ন্যাশনাল মাল্টি স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন অন দ্য ডেভেলপমেন্ট অব অ্যা জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি স্ট্র্যাটেজি ফর দ্য বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, দুঃখের বিষয় হচ্ছে, নারী ভোটারের সংখ্যা ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ হলেও নারী প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ভোটারের সংখ্যাগত দিক থেকে নারীরা শক্তিশালী হলেও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তা নেই বললেই চলে। এটিই আমাদের বাস্তবতা।

তিনি আরও বলেন, মূল সমস্যাটা হচ্ছে আমরা সামাজিক জীব হিসেবে রাজনীতির বাইরে থাকতে পারছি না, আবার রাজনীতিকে ইতিবাচকভাবেও দেখছি না।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমার সন্তান, বোন, মেয়ে বা নারী আত্মীয়স্বজন কাউকেই রাজনীতিতে যেতে উৎসাহিত করি না। শুধু নারী নয়, সামগ্রিকভাবে পরিবার থেকে ছেলেমেয়েদের রাজনীতিতে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয় না।

রাজনীতির পরিবেশ, আর্থসামাজিক অবস্থা, সংস্কৃতি ও মানসিকতাই এর অন্যতম কারণ বলে মনে করে তিনি বলেন, নির্বাচনি চক্রের প্রথম গ্রুপ হচ্ছে সাধারণ জনগণ। ১৮ কোটি মানুষের দেশে নির্বাচনি প্রচারণায় ১৮ বছরের নিচের কিশোররাও বড় ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই কিশোর যখন বাড়িতে আসে, তার মা তাকে বলে রাজনীতির ধারেকাছেও যেও না। নারী হোক বা পুরুষ, পরিবার থেকেই রাজনীতিকে দূরে রাখার প্রবণতা রয়েছে।

নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে রাজনৈতিক দলের ভেতরে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ইনপুট থেকেই আউটপুট আসে। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নারী যদি সংখ্যায় বেশি থাকেন, তাহলে নারী প্রার্থীও বেশি আসবেন। এটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতিগত কারণে রাজনৈতিক দলে যদি ৫০ শতাংশ নারী কর্মী থাকতেন, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোও ৫০ শতাংশ মনোনয়ন নারীদের না দিয়ে পারত না।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করছেন, তাদের অধিকাংশই আগের নির্বাচনগুলোতেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু কমিশনাররা পরিবর্তিত হয়েছেন। আগের কমিশনে যারা ছিলেন, তারা অযোগ্য ছিলেন এমন নয়। তাদেরও যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল। কিন্তু শুধু নির্বাচন কমিশনার, রিটার্নিং কর্মকর্তা বা প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করে একটি নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়।

তার মতে, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য যদি সবার হয় এবং সবার ইচ্ছা ও সংকল্পকে এক বিন্দুতে আনা সম্ভব হয়, তাহলেই সেই ব্যবস্থা টেকসই হবে।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দুটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান আনোয়ারুল ইসলাম। প্রথমত, রাজনীতি খারাপ নয় এবং রাজনীতিতে ভালো মানুষের প্রবেশ জরুরি এই বার্তা ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলের ভেতরে নারীর অধিকার ও মনোনয়ন নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা রাজনৈতিক দলে যত বেশি সংখ্যায় যুক্ত হবেন, তাদের কণ্ঠ তত বেশি শক্তিশালী হবে। তাদের নেতৃত্বও তত মজবুত হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর করার বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল হিসেবে অনেকের অবস্থান তৈরি হয়েছে। তাই আবার যেন বৈষম্যের দিকে ফিরে যাওয়া না হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তারা ভালো করছেন।

নারী কর্মকর্তাদের সংগঠিত নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কেন্দ্রীয়ভাবে থাকা ওমেন নেটওয়ার্ক নারী কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। তারা দলবদ্ধভাবে সচিবের কাছে গিয়ে কোনো দাবি জানালে সেটি উপেক্ষা করা কঠিন। ঐক্য ও চাপ সৃষ্টিকারী শক্তিশালী গ্রুপ থাকলে কাজ হতেই হবে।

নারী কর্মকর্তাদের নির্বাচনি দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রে নারী প্রিজাইডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করলে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার। ২১ হাজার নারী প্রিজাইডিং অফিসার পাওয়া সম্ভব না হলেও এর অর্ধেক করার চেষ্টা করতে হবে। ভোটকেন্দ্রগুলোকে নারী বান্ধব করতে হবে। প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালনে নারীদের উৎসাহিত করতে হবে।

শুধু কথায় নয়, বাস্তবে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কথার সঙ্গে কাজের ফারাক থাকলে বাস্তবে এর প্রতিফলন হবে না। ৩৪ বছর ধরে চাকরি জীবনে নারীর অধিকার নিয়ে কথা শুনে আসছি। টার্মিনোলজি হয়তো একেক সময় একেক রকম হয়েছে, কিন্তু মূলকথা একই। এখন বাস্তবে নারীর অংশগ্রহণ ও সমতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনি চক্রের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অর্ধেক অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে নারীর সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নারীর অধিকার সংরক্ষণ সম্ভব হবে।

নারীদের উদ্দেশে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তাদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে কীভাবে এসব বিষয় আমলে নেওয়া যায়, সেই বিষয়ে প্রচেষ্টা থাকবে।

অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব আব্দুল হালিম, উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এমএইচএইচ/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর