দেশে দিন দিন বাড়ছে বিদেশি ভাষা শেখার প্রবণতা। উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক যোগাযোগের চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের কাছে বিদেশি ভাষা এখন শুধু একটি দক্ষতা নয়, বরং ক্যারিয়ার গড়ার অন্যতম হাতিয়ার।
এই আগ্রহের সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো শিক্ষার্থী এই ইনস্টিটিউটের ভাষা কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু সীমিত আসনের কারণে অনেককেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। ফলে একটি ভাষা শেখার সুযোগ পেতেও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট দেশের অন্যতম প্রধান বিদেশি ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি ভাষা শিক্ষা, অনুবাদ, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে এখানে আরবি, ইংরেজি, চীনা (ম্যান্ডারিন), ফরাসি, জার্মান, ইতালীয়, জাপানি, কোরিয়ান, ফার্সি, রুশ, স্প্যানিশ,তুর্কি, হিন্দি এবং বাংলা (বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য) ভাষাসহ মোট ১৪টি ভাষায় নিয়মিত সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালিত হচ্ছে।
বিভিন্ন সময়ে কোর্সের সংখ্যা পরিবর্তিত হলেও বর্তমানে ১৪টি ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ভাষা ইনস্টিটিউটে। প্রতিটি সার্টিফিকেট কোর্সের মেয়াদ এক বছর এবং মোট ১৫০ ঘণ্টার পাঠদান করা হয়।
ইনস্টিটিউটে শুধু ভাষা শিক্ষা নয়, ইংরেজি ভাষা শিক্ষাবিষয়ক উচ্চতর কোর্স, স্নাতকোত্তর, এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণার সুযোগও রয়েছে। ফলে এটি ভাষা শিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিশ্বায়নের এই সময়ে বিদেশি ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, জার্মানি, ইতালি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদনশিল্প ও নির্মাণ খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে। এসব দেশে পড়াশোনা বা চাকরির ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা জানা থাকলে সুযোগ যেমন বাড়ে, তেমনি আয়ও তুলনামূলক বেশি হয়।
বিশেষ করে জাপানি, কোরিয়ান ও জার্মান ভাষা শেখার প্রতি তরুণদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কারণ এই দেশগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও কর্মীদের জন্য নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একইভাবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিস্তৃত হওয়ায় চীনা ভাষার গুরুত্বও বাড়ছে।
ইনস্টিটিউট সূত্রে খবর, প্রতিবছর ভাষা কোর্সে ব্যাপক সংখ্যক আবেদন জমা পড়ে। সাম্প্রতিক ভর্তি কার্যক্রমেও কয়েক হাজার আবেদনকারী অংশ নিয়েছেন। তবে আসনসংখ্যা সীমিত হওয়ায় অনেক আবেদনকারী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান না।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, প্রতি বছর কতজন শিক্ষার্থী এই ইনস্টিটিউট থেকে ভাষা কোর্স সম্পন্ন করে বের হন, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয় না। ফলে নির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। যদিও বিভিন্ন ভাষার একাধিক ব্যাচ মিলিয়ে প্রতিবছর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা দেন। এ সংখ্যা সরকারি তথ্য নয়, বরং ভর্তি কার্যক্রম ও কোর্স পরিচালনার পরিধি থেকে করা একটি সাধারণ ধারণা।
ভাষা বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ইংরেজি জানাই এখন আর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় বা তৃতীয় একটি বিদেশি ভাষা জানলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, কূটনৈতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, পর্যটন খাত এবং অনুবাদ পেশায় কাজের সুযোগ বহুগুণ বেড়ে যায়।
শুধু চাকরি নয়, ভাষা শিক্ষা ভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কে জানারও একটি কার্যকর মাধ্যম। ফলে বিদেশি ভাষা শেখা একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিকাশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি ভাষা শিক্ষার চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, প্রশিক্ষক তৈরি এবং আসনসংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ভাষা দক্ষতাকে দেশের কর্মসংস্থান নীতির সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
একসময় বিদেশি ভাষা শেখা ছিল সীমিত কয়েকটি পেশার মানুষের প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতায় পরিণত হয়েছে। তাই বিদেশি ভাষা শিক্ষা এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং ভবিষ্যৎ গড়ার একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ।
এম/এএইচ



