ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সরাসরি ভোটে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।
ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর রাজনৈতিক পথচলা। এরপর শিক্ষকতা, সরকারি প্রশাসনে দায়িত্ব পালন, জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব হন তিনি। দলের কঠিন সময়ে দেশের ভেতরে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বিএনপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন মির্জা ফখরুল।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। তিনি পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য ছিলেন। পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যও হন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি ছিলেন। সে সময় তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়।
আরও পড়ুন: ৩৫ বছর পর ইতিহাস ফিরল সংসদে, যেমন হলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৬ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল।
পৌর চেয়ারম্যান থেকে বিএনপিতে
জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের দুই বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এর আগে ও পরে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৯০ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন।
১৯৯১ সালে বিএনপির মনোনয়নে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচন করলেও জয় পাননি। পরে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
প্রতিমন্ত্রী থেকে মহাসচিব
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। পরে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।
২০০৯ সালে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন তিনি।
আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুল পেলেন ২৫৫ ভোট, অলি আহমদ ৮৮
কঠিন সময়ে দলের নেতৃত্ব
২০০৬ সালের পর দীর্ঘ সময় বিএনপি রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার ও কারাবরণ, পরে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে দলটি।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয় পাননি মির্জা ফখরুল। এরপর দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি আন্দোলনে গেলে দলটির শীর্ষ নেতারা গ্রেফতার হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একই সময়ে দলের তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করছিলেন। দেশের ভেতরে বিএনপির নেতৃত্বের বড় দায়িত্ব তখন মির্জা ফখরুলের ওপর পড়ে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে কয়েক দফায় গ্রেফতার হতে হয়েছে। বিভিন্ন সময় হামলা ও নির্যাতনের মুখেও পড়েছেন তিনি।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, খালেদা জিয়া কারাবন্দী থাকার সময় বিএনপি যখন টালমাটাল অবস্থায় ছিল, তখন মির্জা ফখরুলের দৃঢ় অবস্থান দেখা গেছে। বারবার গ্রেফতার ও লাঞ্ছিত হওয়ার পরও তিনি দলের নেতৃত্বে ছিলেন।
‘ক্লিন ইমেজের’ রাজনীতিক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা থাকলেও মির্জা ফখরুলকে এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী হিসেবে দেখেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শামছুল আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, মির্জা ফখরুল নম্র, বিনয়ী ও সদালাপী হিসেবে পরিচিত। অন্য দলের নেতাকর্মীদের নিয়েও তিনি সাধারণত কটূক্তি করতেন না।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, মেয়র, প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে অন্য অনেক রাজনীতিকের মতো নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়নি।
আরও পড়ুন: মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে প্রজ্ঞাপন জারি
জন্ম ও পরিবার
মির্জা ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনি বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। বড় ভাইয়ের মতো তিনিও ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ছাত্রজীবনে রাজনীতির পাশাপাশি নাট্যচর্চা, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল।
এবার বঙ্গভবনের পথে
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু করে শিক্ষকতা, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এবার তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যুক্ত হলো রাষ্ট্রপতির পদ।
দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিক হিসেবে পরিচিতি তাঁর এই দীর্ঘ পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা




