প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে জল্পনা ক্রমেই জোরালো হলেও এখনো কাটেনি ধোঁয়াশা। আগামী সপ্তাহে, বিশেষ করে ২২–২৩ আগস্ট নয়া দিল্লি সফরের প্রস্তুতি চলছে বলে ঢাকা ও দিল্লির বিভিন্ন সূত্রের বরাতে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো সফরের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সফরটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেনি। এমনকি ভারতের কোনো কোনো গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে ফেরত না দিলে তারেক রহমান ভারত সফর করবেন না।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নয়া দিল্লিতে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ভারত আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে নতুন কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ফলে একদিকে সফরের প্রস্তুতি এগিয়ে চলার খবর, অন্যদিকে সরকারি পর্যায়ে তারিখ নিশ্চিত না করার অবস্থান—দুইয়ে মিলে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হতে পারে। সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২২ ও ২৩ আগস্ট সামনে এসেছে। সফরটি হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দিনের সম্ভাব্য সফরটি মূলত দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসহ দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
তবে সফরের দিনক্ষণ ও বিস্তারিত কর্মসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে ২২–২৩ আগস্টের তারিখটি এখনো সম্ভাব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্যও পৃথক আমন্ত্রণ রয়েছে। কিন্তু আমন্ত্রণ জানানো আর সফর চূড়ান্ত হওয়া এক বিষয় নয়।
জয়সওয়াল বলেন, আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে এবং সফর নিয়ে কোনো অগ্রগতি হলে তা জানানো হবে। অর্থাৎ দিল্লির পক্ষ থেকেও এখনো সম্ভাব্য সফরের আনুষ্ঠানিক তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
এর আগে গত ২৯ জুলাই ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছিলেন, দিল্লি বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে ভারত সফরে স্বাগত জানাতে আগ্রহী এবং সফরটি দ্রুত হওয়ার আশা করছে। তবে সফরের সময় নির্ধারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে ধোঁয়াশার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়টি। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকা দিল্লির কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। ১০ আগস্ট ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সময়ে হাসিনার ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বক্তব্য বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন উদ্বেগও ঢাকার পক্ষ থেকে রয়েছে।
এরই মধ্যে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন দাবি করেছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন না এবং ভারত সফরও করবেন না। সংবাদমাধ্যমটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এমন দাবি করেছে। তবে এটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন; বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো শর্ত ঘোষণা করেনি।
অন্যদিকে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরের প্রস্তুতি দুই দেশেই চলছে এবং আগামী সপ্তাহের শেষার্ধে তারেক রহমানের দিল্লি যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দুই ধরনের তথ্য সামনে এসেছে। একটিতে হাসিনা ইস্যুকে সফরের বড় শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, অন্যটিতে সফরের প্রস্তুতি এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এর আগে বলেছেন, ভারত সফরের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক; তবে এখনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচি, দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু সাংবিধানিক কাজ এবং দুই দেশের আলোচনার অগ্রগতির ওপর সফরের সময় নির্ভর করছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের সরকারপ্রধান যখন সরাসরি কথা বলেন বা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করেন, তখন অনেক জটিল সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়। ভারতকেও এই সুযোগ ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
এ বক্তব্য থেকে ধারণা করা যায়, ঢাকা সফরটি বাতিল করার অবস্থানে নেই; বরং আলোচনার মাধ্যমে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে সফরটি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য দিল্লি সফরের সঙ্গে ব্রিকস প্রসঙ্গও যুক্ত হয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়া দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়; তবে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। জুলাইয়ে সেই আমন্ত্রণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায় এবং পরে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
তবে ব্রিকসের আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়েও ঢাকা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। জুলাইয়ের শেষ দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, সরকার আমন্ত্রণটি পর্যালোচনা করছে এবং সিদ্ধান্ত হলে জানানো হবে।
এ কারণে সম্ভাব্য আগস্ট সফর এবং সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলন—দুটি বিষয়কে ঘিরেই ঢাকা-দিল্লির কূটনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেবি




