গুলশান সেন্ট্রাল পার্কের মাঠ ব্যবহারের জন্য নাগরিকদের কাছ থেকে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব অর্থ আদায় করছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে অবগত থাকার পরও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নীরব ভূমিকার সমালোচনা করেছেন মাঠ, পার্ক ও জলাধার দখলমুক্ত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
তারা বলছেন, একটি ক্লাবের স্বার্থে সরকারি মাঠ ও পার্ক ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া বেআইনি এবং নাগরিক অধিকার পরিপন্থি।
বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এসব কথা বলেন। বিবৃতিতে তারা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে পার্ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে রাজউকের সমঝোতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৯ আগস্ট নিউ এইজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রাজউক চেয়ারম্যান মাঠ ব্যবহারের জন্য গুলশান ইয়ুথ ক্লাব কর্তৃক অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে নাগরিকদের জন্য দেশের মাঠ ও পার্ক বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা এবং এসব স্থান অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দখলের অভিযোগ থাকা গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে পার্ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়ার লক্ষ্যে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষর করা বিস্ময়কর এবং জনস্বার্থবিরোধী।
তারা বলেন, একটি ক্লাবের স্বার্থে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের এমন নতজানু নীতি সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। মাঠ ও পার্ক কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়, এগুলো জনগণের সম্পদ। অর্থের বিনিময়ে নাগরিকদের খেলাধুলার সুযোগ সীমিত করা তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার শামিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জনগণের খেলার মাঠ ও পার্ককে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মাঠে বেআইনি স্থাপনা নির্মাণ ও দখলের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজউক, সিটি করপোরেশন ও গণপূর্ত-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্লাবটি বিভিন্ন সময়ে সুবিধা ও সমর্থন পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অতীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে মাঠটি দখলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি রাজউক সেই ক্লাবের সঙ্গেই পার্ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে চুক্তি করেছে, যা জনস্বার্থে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, মাঠ ও পার্কের দখল বজায় রাখতে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব বিভিন্ন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র ও সরকারি কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে মাঠে ফলক স্থাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে আসছে।
এ কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র ও সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের দখলদারির অভিযোগ থাকা কোনো ক্লাবের সঙ্গে নিজের বা পরিবারের সদস্যদের সদস্যপদ, সম্পৃক্ততা কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি বছরের পর বছর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি মাঠ ও পার্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার নয়, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগ ও সদিচ্ছাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউক একটি ক্লাবের সীমিতসংখ্যক সদস্যের স্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ায় তীব্র নিন্দা জানান তারা।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ক্লাবের স্বার্থে নয়, জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক, অর্থাৎ শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্ক, দখল বন্ধ ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবিতে একাধিক রিট মামলা হয়েছে।
এসব মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে, গণপূর্ত, রাজউক ও সিটি করপোরেশনের ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ও প্রভাব ব্যবহার করে গুলশান ইয়ুথ ক্লাব দীর্ঘদিন ধরে মাঠের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
এ অবস্থায় সরকারি মাঠ ও পার্ককে ক্লাবের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে সাধারণ নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন বিবৃতিদাতারা।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন— সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ফিরোজ আহমেদ, নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান, তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সৈয়দা রতনা, পাবলিক হেলথ ল ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ, বাংলাদেশ গাছ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাঈম উল হাসান ও আমিরুল রাজিব, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম, সাংবাদিক ও জনস্বাস্থ্য গবেষক সুশান্ত সিনহা, বারসিকের নগর গবেষক ও সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশাহিদা সুলতানা, গবেষক ও সাংবাদিক ইব্রাহীম খলিল এবং সিটিজেন নেটওয়ার্কের নির্বাহী আমিনুল ইসলাম।
এএইচ/এআরএম




