বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

বিটিআইয়ের ভবনে নাজুক নিরাপত্তা, ৭ মাসে প্রাণ গেল ২ শ্রমিকের

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

বিটিআইয়ের ভবনে নাজুক নিরাপত্তা, ৭ মাসে প্রাণ গেল ২ শ্রমিকের
বিটিআইয়ের ভবনে নাজুক নিরাপত্তা কারণে ৭ মাসে প্রাণ গেল ২ শ্রমিকের। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীতে আবাসন প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াসের (বিটিআই) নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তার অবহেলায় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। হতভাগ্য এই শ্রমিকের ভাইয়ের কাছে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হলেও তা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিটিআই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেডের (বিটিআই) একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনে শুরু থেকেই নিরাপত্তাব্যবস্থা নাজুক। যথাযথ নিরাপত্তাবেষ্টনী না থাকার কারণে গত সাত মাসে ওই ভবনটিতে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু ও দুজনের পঙ্গুত্ববরণের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন জাহিদ আনোয়ার নামে এক ব্যক্তি। ভবনটিতে সর্বশেষ দুর্ঘটনা ঘটে গত ৬ আগস্ট।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট দুপুরে বসুন্ধরা এলাকার কে-ব্লকের এভিনিউ-৫-এর ১৭৬ ও ১৭৭ নম্বর প্লটে বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন ভবনের চতুর্থ তলায় কাজ করছিলেন শহীদুল ও এরশাদুল নামে দুজন নির্মাণশ্রমিক। এ সময় লোহার রড নির্মাণাধীন ভবনের সামনের হাইভোল্টেজ বিদ্যুতের তারে লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজন চতুর্থ তলা থেকে ছিটকে দোতলার কার্নিশে পড়েন। অপর শ্রমিক ভবনের নিচে পড়ে যান। এতে দুজনই গুরুতর আহত হন।

দুর্ঘটনার পর আহত দুই শ্রমিককে তাৎক্ষণিক হাসপাতালে না নিয়ে ভবনের ভেতরে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা হয়। একপর্যায়ে আহত শহীদুল ইসলাম (২৫) মারা যান। পরে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরও বেশ কিছু সময় পর আহত অপর শ্রমিক এরশাদুলকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

নিহত শহীদুলের বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা এলাকায়। তিনি তিন সন্তানের জনক। দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অপর শ্রমিক এরশাদুলের হাত-পা ভেঙে গেছে। কোমরেও আঘাত পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।

যদিও বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন এই ভবনের ম্যানেজার মো. ওয়াদুদ ঢাকা মেইলকে দাবি করেছেন, আহত শ্রমিক সুস্থ হয়ে কাজে ফিরেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় ওই এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে এবং দুই নির্মাণশ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য যাতে সিসিটিভির ফুটেজে ধরা না পড়ে, সে জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়। সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া হলে শহীদুলের জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো বলে মনে করছেন তাঁরা।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের ভবনের পাশেই বিটিআইয়ের ওই ভবনটি অবস্থিত। ৬ আগস্ট দুপুর ২টার পর দুর্ঘটনার খবর পেয়েই আমি ঘটনাস্থলে যাই। গিয়ে দেখি, আহত দুই শ্রমিককে হাসপাতালে না নিয়ে ভবনের ভেতরে নিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের পা ও হাত ভাঙা ছিল। কোমরেও আঘাত ছিল। আর যিনি কার্নিশে পড়ে গিয়েছিলেন, তাঁর হাত পুড়ে গিয়েছিল। বুকেও আঘাত ছিল।

ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শীও ভয়ে নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পর দুজন শ্রমিককে ভবনের ভেতরে নিয়ে ফেলে রাখা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নিলে হয়তো একজনের জীবন বাঁচানো যেত।

তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন ওই ভবনটিতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য সেফটি নেট, ফল প্রটেকশন (Fall Protection) ব্যবস্থা, রেলিং বা ব্যারিকেড এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) ছিল না। এমনকি ভবনের অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক সংযোগও ছিল চরম অরক্ষিত।

গত শনিবার নিহত শহীদুলের বাবা জানান, আমার ছেলের মৃত্যুর পর বিটিআই কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করেনি এবং আমাদের কোনো সহযোগিতাও করা হয়নি।

এর আগে গত ২৭ জুন বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন এই ভবন থেকেই একইভাবে লোহার রড বিদ্যুতের তারে লেগে নিচে পড়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন আরেক নির্মাণশ্রমিক। তাঁর নাম-পরিচয় জানা না গেলেও ওই দিনের একটি ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সূত্রে তাঁর বাড়ি রংপুর বলে জানা গেছে। ভবন নির্মাণের শুরুর দিকে, অর্থাৎ ছয়-সাত মাস আগে, আরও একজন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন আশপাশের ভবনের নির্মাণশ্রমিক ও একাধিক কেয়ারটেকার। তবে ভয়ে তাঁরা কেউই হতাহত ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি। বিটিআইয়ের নির্মাণাধীন ভবনের কোনো শ্রমিকও এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না।

এদিকে এসব ঘটনায় থানায় জিডি দায়ের করা ব্যক্তি জাহিদ আনোয়ার বলেন, ভবনটির সামনে পল্লী বিদ্যুতের হাইভোল্টেজ বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। শুধু তা-ই নয়, গত ২৭ জুন দুর্ঘটনায় একজন পঙ্গুত্ববরণ করলেও তারা ভবনটিতে নিরাপত্তাবেষ্টনী নিশ্চিত করেনি। তখন নিরাপত্তাবেষ্টনী দিলে গত ৬ আগস্ট হয়তো এ দুর্ঘটনা ঘটত না।

তিনি আরও বলেন, গত দুটি দুর্ঘটনার আমি প্রত্যক্ষদর্শী। বিটিআই শত শত কোটি টাকা খরচ করে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করলেও শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বারবার দুর্ঘটনার পরও তারা নিরাপত্তাবেষ্টনী দিতে চরম অবহেলা করেছে। শ্রমিকদের জীবনের কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। ফলে এ ধরনের মৃত্যুকে অপমৃত্যু বলার সুযোগ নেই, এটা স্রেফ হত্যাকাণ্ড।

জাহিদ আনোয়ার বলেন, বিটিআইয়ের মতো নামধারী প্রতিষ্ঠান কেন শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিতে চরম অবহেলার পরিচয় দিচ্ছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আর যেন একজন নির্মাণশ্রমিককেও এভাবে জীবন দিতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এ বিষয়ে বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রজেক্ট ডিরেক্টর, সাইট ইঞ্জিনিয়ারসহ জড়িত সবার ভূমিকা নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের আওতায় এনে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন জাহিদ আনোয়ার।

নির্মাণাধীন ওই ভবনের দায়িত্বে থাকা বিটিআইয়ের ম্যানেজার মো. ওয়াদুদ দুর্ঘটনা ও হতাহতের কথা স্বীকার করে ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের ভবনে নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে। এরপরও একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। একজন মারা গেছেন, তাঁর পরিবারের কাছে আমরা লাশ তুলে দিয়েছি। সহযোগিতাও করেছি। আরেকজন আহত ছিলেন, তিনি হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে এসেছেন।

যদিও আহত শ্রমিকের হাত, পাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে যাওয়ার কারণে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন আছে। শরীরের একাধিক জায়গায় ব্যান্ডেজ করতে হয়েছে।

নিহত শ্রমিকের পরিবারকে মামলা না করতে চাপ প্রয়োগ করা এবং যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. ওয়াদুদ বলেন, না, এমন কোনো ঘটনা হয়নি। পুলিশও ছিল যখন এসব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, বিটিআইয়ের ওই ভবনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুজন শ্রমিক পড়ে যাওয়ার পর একজন মারা গেছেন। তার শরীরে পোড়া দাগও ছিল। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। পরে ময়নাতদন্তও হয়েছে। যদি সুরতহাল প্রতিবেদনে কোনো অসঙ্গতি কিংবা অন্য কোনোভাবে মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে এটি হত্যা মামলা হয়ে যাবে।

এরপরও যদি কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করতে চান, তিনি আদালতে করতে পারবেন বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

বিইউ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর