সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সমুদ্র ও ‘চিকেন নেক’ ঘিরে সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ তাজুলের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

সমুদ্র ও ‘চিকেন নেক’ ঘিরে সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ তাজুলের
জাতীয় প্রেসক্লাবে এক আলোচনা সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। ছবি- ঢাকা মেইল

দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম।

সোমবার (১০ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ আয়োজিত ‘নতুন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কৌশল’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এমন অভিমত প্রকাশ করেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রকে সক্ষম ও শক্তিশালী করতে ভিশনারি নেতৃত্ব প্রয়োজন। রাষ্ট্রের নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে সার্বভৌমত্বের ধারণা পরিষ্কার থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন পরিহার করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর বড় ক্ষেত্র বঙ্গোপসাগর। সাগরের তলদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হিসেবে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বও উপলব্ধি করতে হবে। ভবিষ্যতে মালাক্কা প্রণালি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প বাণিজ্যপথ হিসেবে বঙ্গোপসাগর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।’

সাবেক চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘চীন থেকে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চল হয়ে বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করে বিকল্প বাণিজ্যপথ তৈরি করা সম্ভব হলে তা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই বাণিজ্যপথের ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ বড় সুবিধা পেতে পারে। এজন্য বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘খুলনা-পাইকগাছা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে আরও বন্দর গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এসব অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু তৈরি পোশাক শিল্পনির্ভর অর্থনীতি না রেখে বহুমুখী শিল্প ও বাণিজ্যভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে।’

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ভরতার সমালোচনা করে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে একটি রাষ্ট্র চললে সে কখনো মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না। তাই দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী  করতে হবে।’

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেশের যোগাযোগের ‘চিকেন নেক’ অঞ্চলটিও গুরুত্বপূর্ণ। এসব কৌশলগত এলাকায় অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে সামরিক সক্ষমতা অন্য কোনো রাষ্ট্রকে আক্রমণের জন্য নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমন সক্ষমতা অর্জন করতে হবে যাতে বাংলাদেশকে আক্রমণ করার আগে অন্য কোনো রাষ্ট্রকে বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয় এবং আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশ শক্ত অবস্থান থেকে দর-কষাকষি করতে পারে।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় পদ্মা ব্যারেজ, বঙ্গোপসাগর, বন্দর ও শিল্প অবকাঠামোর ওপর নিজেদের সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে। এ জন্য জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্ব প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক বিরোধের কারণে জাতির মধ্যে বিভাজন তৈরি করা যাবে না। একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা জরুরি।’

ইরানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘দেশটির ওপর হামলা ও চাপ যত বেড়েছে, জনগণের মধ্যে ঐক্য তত দৃঢ় হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন, যাতে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিতে পারে।’

বর্তমান সরকারের সীমান্তনীতির বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্তে বাংলাদেশের অবস্থান ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আচরণে পরিবর্তন এসেছে। দেশের ভূখণ্ডে অন্য কোনো রাষ্ট্র চোখ রাঙালে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।’

তবে একই সঙ্গে জুলাই জাদুঘর থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলন ও সীমান্তসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রদর্শনী সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ফেলানীর প্রদর্শনী, কাঁটাতারের বেড়া এবং মোদি-বিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত যে অংশগুলো ছিল, সেগুলো কেন সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তা সরকারকে জবাব দিতে হবে। এসব বিষয় বাংলাদেশের জনগণের আবেগ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই জাদুঘরে এসব বিষয় পুনঃস্থাপন করা উচিত। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সরকার দৃঢ় অবস্থান নিলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তারা সরকারের পাশে থাকবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা বদলে যাওয়া বাংলাদেশ।’ রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি কিংবা কোনো বিষয়ে নতজানু হওয়ার চেষ্টা করলে জনগণ তা মেনে নেবে না।’

সার্বভৌমত্ব নিয়ে আরও বেশি আলোচনা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘ছোট রাষ্ট্র কীভাবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে, সে বিষয়ে জনগণের মধ্যে ধারণা তৈরি করতে হবে। দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা জরুরি যে বাংলাদেশও নিজের সক্ষমতা দিয়ে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে।’

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা দেশের ভবিষ্যৎ পথচলায় কাজে লাগাতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই বিপ্লব দেশের সামনে নতুন সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’

এম/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর