রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর হয়ে গেল। বুধবার (৫ আগস্ট) যথাযথ মর্যাদায় দেশব্যাপী পালিত হলো অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী। কিন্তু আজও ওই আন্দোলনে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। উল্টো, যত দিন যাচ্ছে, ততই প্রশ্ন ও সংশয় বাড়ছে। ইস্যুটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিহতদের সংখ্যা নিয়ে এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারের হিসেবের সঙ্গে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানের বিশাল ফাঁরাক। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হয়তো দুই হিসেবের ব্যবধানের জায়গাটি অনেকটাই কমে আসবে।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে জুলাই শহীদের সর্বশেষ যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৩ জনে। অন্যদিকে জাতিসংঘের রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা ১৪০০ জনের মতো হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যার পার্থক্য এখনো পাঁচশ’রও বেশি।

এ ব্যাপারে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক স্বৈরশাসকের পক্ষে যাচ্ছে এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা এটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গ অভ্যুত্থান নিয়ে নানা প্রপাগান্ডা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।’
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুরুত্ব দিয়ে তালিকা তৈরি না করার কারণেই বিতর্কটি এতদূর গড়িয়েছে।
তবে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ‘এখনো সুযোগ আছে প্রতিটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা তুলে আনার। সেটা করা না হলে বিতর্ক থেকেই যাবে, যেমনটা একাত্তরে শহীদের সংখ্যা নিয়ে থেকে গেছে।’
বর্তমান সরকার অবশ্য বলছে, তারা নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তুলে এনে একটা নির্ভুল তালিকা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি এবং কাজটি যেন ঠিকঠাক হয়, সেজন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটা আলাদা অধিদফতরই তৈরি করে দিয়েছি।’
কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি তথ্যের মধ্যে এত পার্থক্যের কারণ কী?
জাতিসংঘের রিপোর্টে কী ছিল?
২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, হতাহতদের স্বজন, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন মহলের মানুষজন।
পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানালে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সহিংসতা, প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করে।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে তদন্ত ও পর্যালোচনার পর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক।

সেই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিক্ষোভ ও বিক্ষোভ পরবর্তী সহিংসতায় বাংলাদেশে ১৪০০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে।
নিহতদের বেশিরভাগের মৃত্যু দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র, সামরিক রাইফেল এবং শটগানের গুলিতে হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় কাজে নেতৃত্বে ছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তাদের দুজনের নির্দেশেই বিক্ষোভ দমনে পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ‘মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে’ বলে জাতিসংঘের তদন্তে উঠে আসে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। এর বাইরে আরও হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। সেইসঙ্গে সাড়ে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে নির্বিচারে আটক ও নির্যাতন করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
তথ্যের উৎস কী?
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, হতাহতদের বিষয়ে যেসব তথ্য তারা প্রকাশ করেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশই তদন্তকারীরা পেয়েছেন বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে।
এর মধ্যে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জুলাই-আগস্টে নিহত ৮৪১ জন বিক্ষোভকারীর তালিকা পান জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা। তারা গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের কাছ থেকেও নিহত আরও ৩১৪ জনের একটি তালিকা সংগ্রহ করেন, যেখানে মৃত ব্যক্তিদের নাম এবং মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ ছিল।
এনএসআইয়ের ভাষ্য, নিহত এসব ব্যক্তিদের নাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে, মানবাধিকার সংস্থাসহ বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিহতদের আরও বেশ কয়েকটি তালিকা সংগ্রহ করেন তদন্তকারী দলের সদস্যরা।

বিভিন্ন তালিকা পর্যালোচনা করার সময় নিহতদের মধ্যে যাদের নাম দুইবার পাওয়া গেছে, তাদের ক্ষেত্রে কেবল একবারই নাম গোনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও বিক্ষোভকারীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি মর্গগুলো থেকেও নিহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওএইচসিএইচআর মূল্যায়ন করেছে যে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভে কমপক্ষে ১৩ জন নারীসহ এক হাজার ৪০০ জন নিহত হতে পারেন। তবে নিহতদের নামের কোনো তালিকা জাতিংঘের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।
বৈষম্যবিরোধীরা তথ্য নিয়েছিলেন কোথা থেকে?
চব্বিশের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকেই হতাহতদের বিষয়ে হিসাব রাখার চেষ্টা করছিল গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ওই সময় নিহতদের প্রাথমিক একটি তালিকাও তৈরি করতে দেখা গিয়েছিল তাদের। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর হতাহতদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে প্ল্যাটফর্মটি।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ-কমিটি এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সারাদেশে তারা প্রায় এক হাজার ৫৮১ জন নিহতের তথ্য পেয়েছেন।
সেসময় ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও হাসপাতালের তথ্যের পাশাপাশি গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও হতাহতদের বিষয়ে তথ্য নিয়েছিলেন বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপ-কমিটির তৎকালীন সদস্যসচিব তারেকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ‘খুবই অল্প সময়ের মধ্যে কাজটি করেছিলাম তো আমরা, সেজন্য নানাভাবে আমরা নামগুলো এক জায়গায় করে একটা খসড়া তালিকা তৈরি করলাম।’
তবে নিহতদের সেই তালিকায় যাদের নাম ছিল, তাদের সবার বিষয়ে অবশ্য তখনও বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করতে সক্ষম হননি তারা। ফলে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পরবর্তীতে খসড়া তালিকাটি তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই নেতা।
সরকারি তালিকায় কারা?
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার আগেই অবশ্য আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে একটি খসড়া তালিকা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার।
মূলত আন্দোলন চলাকালে নিহতদের যতটুকু তথ্য সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের কাছে ছিল, সেগুলো দিয়েই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খসড়া একটি তালিকা প্রকাশ করে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সারাদেশ থেকে যেন ওই তালিকায় তথ্য সংশোধন ও সংযোজন করতে পারেন, সেজন্য আলাদা একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। নিহতদের পরিবারের সদস্য, ওয়ারিশ ও প্রতিনিধিদেরকে ওই তালিকায় প্রকাশিত ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই, সংশোধন ও পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আহ্বানও জানানো হয়।

আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে কারও নাম ওই খসড়া তালিকায় পাওয়া না গেলে তাদের স্বজনদেরকে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণসহ নিজ নিজ জেলার প্রশাসক, সিভিল সার্জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৈরি করা খসড়া তালিকাও যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেয় সরকার।
গণঅভ্যুত্থান অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের বলেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি যেন নির্ভুলভাবে হয়, সেজন্য প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। সেসব কমিটিতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সিভিল সার্জনরা যেমন ছিলেন, তেমনি জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।’
যাচাই-বাছাইয়ের পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাদের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, সেগুলোই পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে সরকার। যদিও প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরও নিহতদের তালিকায় একাধিকবার কাঁটাছেড়া হতে দেখা গেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রকাশিত গেজেটে ৮৫৬ জনের নাম দেখা হলেও পরবর্তীতে সেটি কমে ৮৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।

আনোয়ারুল নাসের বলেন, ‘এক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপনে নাম প্রকাশের পর কিছু নামের বিষয়ে অভিযোগ আসে যে, ভুল তথ্য দিয়ে তাদের নাম তালিকায় ঢোকানা হয়েছে। পরে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৩ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন তালিকায় নিহতের যে সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, সেখানেও সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ আছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এটি একটা চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে নতুন কেউ আবেদন করলে সেটি যেমন যাচাই-বাছাই করা হবে, তেমনি তালিকায় নাম থাকা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সেটাও খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে।’
তথ্যে এত ফাঁরাক কেন?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির সরকারি হিসেবের সঙ্গে বেসরকারির ব্যবধান পাঁচশ’রও বেশি। দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে বিশাল এই ফাঁরাকের পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘এক্ষেত্রে প্রথমে যে বিষয়টি সামনে চলে আসে, সেটি হলো সহিংসতায় নিহত সবাইকে সরকারি তালিকায় রাখা হয়নি। সরকার মূলত জুলাই শহীদদের তালিকা তৈরির চেষ্টা করছে।’

এই জুলাই শহীদ ঠিক কারা, সেটি সম্পর্কে সুস্পষ্ট একটি ধারণা পাওয়া যায় সাবেক অন্তর্র্বতী সরকারের সময় জারি করা বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন থেকে।
এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশে’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা উক্ত সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের আক্রমণে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি।’
সেজন্য কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিরাই সরকারি তালিকায় জায়গা পেয়েছেন।
কিন্তু আন্দোলন চলাকালে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন সরকারের সমর্থকরাও অনেকে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত ৪৪ জন পুলিশ সদস্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল পুলিশ সদর দফতর। এর বাইরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীও মারা গেছে।

কিন্তু জুলাই শহীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাদেরকে সরকারি তালিকায় রাখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের।
অন্যদিকে বিক্ষোভকারী, পুলিশ, আওয়ামী লীগ সমর্থক- নির্বিশেষে নিহত যত লোকের তথ্য পাওয়া গেছে, সবাইকে রেখেই তালিকা তৈরি করেছেন জাতিসংঘের তদন্তকারী দলের সদস্যরা।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘এখন সরকারেরও উচিৎ জুলাই শহীদের তালিকার পাশাপাশি পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকরা যারা নিহত হয়েছিল, তাদের সবার তালিকা তৈরি করে নিহতের একটা টোটাল সংখ্যা প্রকাশ করা।’
দালিলিক প্রমাণ ঘিরে সংকট
সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় পার্থক্যের আরেকটি কারণ হিসেবে সামনে আসছে, সব মৃত্যুর দালিলিক প্রমাণ না থাকা।

বাংলাদেশ সরকারের তৈরি করা তালিকার বিষয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘এই তথ্য সম্ভবত অসম্পূর্ণ। কারণ চিকিৎসাকর্মীরা প্রায়ই নিহত ও আহতদের ভিড়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন, যার ফলে অনেক তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয়নি।’
গ্রেফতার ও সরকারের রোষানল এড়াতে অনেক পরিবার সেসময় ময়নাতদন্ত ছাড়াই নিহত স্বজনের মরদেহ দাফন করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভ-সম্পর্কিত মৃত্যু এবং আহতদের নাম নিবন্ধন থেকে বিরত রাখতে ভয় দেখানো হয়েছিল বলে জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘হতাহতদের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি নিজেও এসব ধরনের ঘটনাগুলো দেখেছি। ফলে হাসপাতালের কাছে নিহতদের সবার ব্যাপারে তথ্য না থাকাটাই স্বাভাবিক।’
কিন্তু এখন সরকারি তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে হাসপাতালের নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ বা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের মতো দালিলিক প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগের সুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা তারেকুল ইসলাম বলেন, ‘এর ফলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের তালিকায় নাম আছে- এমন অনেক জেনুইন শহীদের নামও সরকারি তালিকায় জায়গা পায়নি।’
তবে গণঅভ্যুত্থান অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তালিকায় নাম তোলার সুযোগ নেই। এই জায়গায় খুব একটা শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ শিথিলতা দেখালেই তালিকায় অনেক ভুয়া ব্যক্তিদের নাম ঢুকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

আরও যত কারণ
আন্দোলনের সময় নিহত অনেকেরই পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। কেবল ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে এ ধরনের ১১৪টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম।
ডিএনএ টেস্ট করে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে মাত্র আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ (সিআইডি)। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা বাকি মরদেহগুলোর বিষয়ে কোনো দাবিদার খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
আবার ইন্টারনেট সুবিধা না থাকা কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জড়ানোর ভয়েও শহীদদের কারও কারও পরিবার সরকারি তালিকায় নাম তোলার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে দাবি করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
সুতরাং এসব সমস্যার সমাধান না করলে নিহতের সঠিক সংখ্যাটা বের করা সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ



