জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে গণমাধ্যমের সঙ্গে ফের ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন ভারতে পলাতক আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ।
বুধবার (৫ আগস্ট) এক বিষয়ে কড়া বিবৃতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাতে জানানো হয়েছে, দিল্লি থেকে ভার্চুয়ালি সভায় বক্তব্য দিয়ে হাসিনা এবং তার সহযোগীরা বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, সাবেক অন্তর্র্বতী সরকার এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বিষোদগার করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের ওপর এ ধরনের অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগে থেকেই ভারত সরকারকে উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল ঢাকা। এরপরও অনুষ্ঠানটি আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বাংলাদেশের মানুষ যখন জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে, ঠিক সেই দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জাতিসংঘের দ্বারা প্রমাণিত তথ্য ও অনুসন্ধানকে অস্বীকার করা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয় অস্বীকার করা পলাতক দণ্ডিত গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার সহযোগীদের ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের জনগণ অতীতে এ ধরনের জঘন্য প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনো তা অব্যাহত রেখেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ যে, দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার যুগে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনো কোনো ‘অনুগত রাষ্ট্রে’ পরিণত হবে না।
দণ্ডিত গণহত্যাকারী হাসিনা ও তার ‘মাফিয়া চক্র’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো স্থান থাকবে না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে গঠনমূলক, পারস্পরিকভাবে লাভজনক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী বলেও জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ সম্পর্ক সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক সম্মান, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডিত অপরাধী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকা বারবার ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানালেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এর বিপরীতে যেকোনো অজুহাতে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত হেনেছে এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালানোর পর ৫ আগস্ট দিল্লিতে বসে প্রথমবারের মতো ভিডিও কনফারেন্স করবেন শেখ হাসিনা। কিন্তু পরে জানা যায়, ভিডিও নয়, তিনি বরাবরের মতো অডিও বার্তা দেবেন।
এ খবর ছড়ানোর পর সোমবার (৩ আগস্ট) বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে হাসিনার অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, ভারতে বসে বাংলাদেশের দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
একই দিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে ভারতের উদ্দেশে একই বার্তা দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। হাসিনাকে ভারত সরকার তাদের দেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সভা-সেমিনার করার সুযোগ দেবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কিন্তু বুধবার (৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় ঠিকই দিল্লিতে বসে সভা করেন ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি তার ছেলে জয়, ক্রিকেটার ও সাবেক এমপি সাকিব আল এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলসহ অনেকেই ভার্চুয়ালি উপস্থিত হন।
তবে সেখানে অডিও বার্তায় বরাবরের মতোই জুলাই আন্দোলন, অন্তর্র্বতী সরকার এবং বর্তমান সরকারকে নিয়ে বিষোদগার করেন হাসিনা। তার বক্তব্যে ছিল না প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতা হত্যা এবং হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করা নিয়ে কোনো অনুশোচনা।
এসএইচ/এএইচ




