জাতীয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে উদ্বোধনের পরপরই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের সামনে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। সকালেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাদুঘরটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন শেষে এটি সেদিনই জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হবে, এমন প্রত্যাশা নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা জাদুঘরের সামনে জড়ো হন। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বুধবার শুধু উদ্বোধনী কার্যক্রম হবে, জনসাধারণের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত করা হবে ৬ আগস্ট থেকে।
এই ঘোষণার পর জাদুঘরের প্রধান ফটকের সামনে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। কেউ সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে পরদিন আসার কথা জানালেও, অনেকেই অন্তত উদ্বোধনের দিন এক বা দুই ঘণ্টার জন্য জাদুঘরটি খুলে দেওয়ার দাবি জানান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। জাদুঘরের প্রতিটি প্রবেশপথে শত শত মানুষ অপেক্ষা করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
দর্শনার্থীরা জানান, জাতীয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে জাদুঘরের উদ্বোধন হওয়ায় সেদিনই অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেকেই উদ্বোধনের দিন জাদুঘরটি দেখার প্রত্যাশা নিয়ে এসেছিলেন। তাই উদ্বোধনের পর গেট খুলে সীমিত সময়ের জন্য হলেও দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ দিলে মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটত। একই সঙ্গে জাদুঘরে ৫০ টাকা প্রবেশমূল্য নির্ধারণের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তারা।
তারা আরও জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসের অংশ। তাই এই স্মৃতি সবার জন্য সহজলভ্য ও উন্মুক্ত থাকা উচিত।
দর্শনার্থী সারোয়ার হোসেন বলেন, ‘জাতীয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসেই যখন জাদুঘরটির উদ্বোধন হলো, তখন আমাদের প্রত্যাশা ছিল অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও এটি সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে। আমরা অনেকেই সকাল থেকেই এখানে অপেক্ষা করছি। উদ্বোধনের দিন ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানটি একনজর দেখার সুযোগ পেলে সেটি আমাদের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকত। কাল থেকে টিকিট ব্যবস্থা চালু থাকুক, এতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু আজ যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কষ্ট করে এসেছেন, তাদের অন্তত এক বা দুই ঘণ্টার জন্য ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া যেত।’
আরেক দর্শনার্থী আবুল কালাম বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পদ নয়, এটি পুরো জাতির অর্জন। তাই এই জাদুঘরও জনগণের জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। সরকার ৫০ টাকা প্রবেশমূল্য নির্ধারণ করেছে, কিন্তু আমার মনে হয় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা দরকার। অনেক মানুষ পরিবার নিয়ে আসবেন, শিক্ষার্থীরা আসবে, নিম্ন আয়ের মানুষও ইতিহাস জানতে চাইবেন। তাদের জন্য এই প্রবেশমূল্য একটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা চাই, দেশের প্রতিটি মানুষ যেন সহজেই এই জাদুঘরে এসে জুলাইয়ের ইতিহাস জানতে পারে, শহীদদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও সেই ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে।’
মিরপুর থেকে আসা দর্শনার্থী শফিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা কেউ এখানে বিশৃঙ্খলা করতে আসিনি। আমরা এসেছি জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি কাছ থেকে দেখতে এবং যারা জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু এসে শুনলাম আজ কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। যদি আগেই সব মাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হতো, তাহলে হয়তো এত মানুষ এখানে আসতেন না। অনেকে দূর-দূরান্ত থেকে কয়েকশ টাকা খরচ করে এসেছেন। উদ্বোধনের দিন মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সীমিত সংখ্যায় হলেও প্রবেশের সুযোগ দিলে ভালো হতো। এতে মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে, সেটি তৈরি হতো না।’
জাতীয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে উদ্বোধনের কথা শুনে গাজীপুর থেকে এসেছেন দর্শনার্থী মানিক হোসেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়। সেই ইতিহাসের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য জাদুঘর নির্মাণ অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে উদ্বোধনের দিন মানুষকে বাইরে রেখে দেওয়াটা অনেকের কাছেই কষ্টের হয়েছে। আমরা চাই না কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হোক, আবার এটাও চাই না যে মানুষ ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হোক।’
এদিকে জাদুঘরের সামনে অবস্থান নেওয়া দর্শনার্থীদের একাংশ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে তারা বলেন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সময় লাগবে। তাই প্রথম দিন প্রবেশ সীমিত রাখার সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পরদিন থেকে যেন কোনো জটিলতা ছাড়াই মানুষ জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ পান, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।
দুপুরের দিকে জাদুঘরের সামনে কিছুটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে কর্তৃপক্ষ আবারও মাইকিং করে জানায়, বুধবার কোনো দর্শনার্থীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না এবং ৬ আগস্ট থেকে নির্ধারিত নিয়মে জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ ঘোষণা শোনার পর ধীরে ধীরে অপেক্ষমাণ মানুষ সেখান থেকে সরে যেতে শুরু করেন। অনেকেই বলেন, ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দেখার জন্য তারা পরদিন আবারও ফিরে আসবেন।
এএইচ/এমআই




