সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার এবং পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন ও সংস্কার কৌশলপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ মুহাম্মদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেছেন, আগামী ১৭ আগস্ট সরকারের ১৮০ দিন পূর্তির আগেই এডিপির এই পুনর্বিন্যাসের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। সংশোধিত এডিপিতে শুধু নতুন প্রকল্প নয়, চলমান প্রকল্পগুলোকেও নতুন কৌশলপত্রের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘লেবার মার্কেট টাইটনেস অ্যান্ড অ্যাগ্রিগেট শকস: এভিডেন্স ফ্রম বাংলাদেশস লার্জেস্ট অনলাইন জব পোর্টাল’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক আতনু রাব্বানী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. এ কে এনামুল হক।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান এডিপি প্রস্তুতের সময় সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রণয়নাধীন পাঁচ বছরব্যাপী উন্নয়ন ও সংস্কার কৌশলপত্রের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না। সেই কারণে বাজেট ঘোষণার পরও প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ১৭ আগস্টের আগেই আমরা এই কাজ শেষ করতে চাই। তখন এক ধরনের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দাঁড়াবে, যা সরকারের ইশতেহার ও কৌশলপত্রের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তিনি আরও বলেন, এ লক্ষ্যে প্রায় ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ৬২টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করতে হচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পের লক্ষ্য, নকশা ও বাস্তবায়ন কাঠামো নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। গত কয়েক মাসের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক প্রকল্প আগেই নেওয়া হলেও সেগুলোর গুণগত মান, লক্ষ্য অর্জনের সক্ষমতা এবং নকশায় বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সাকি বলেন, প্রকল্প ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ভিন্ন রেট শিডিউলের পরিবর্তে একটি অভিন্ন ও বিশেষায়িত রেট শিডিউল তৈরির কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) একটি সফটওয়্যার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারিত রেট শিডিউলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে। প্রতিটি প্রকল্পের ব্যয় ম্যানুয়ালি যাচাই করা বাস্তবে খুবই কঠিন। তাই প্রযুক্তির সহায়তায় এই প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করতে চাই।
ডিজিটাল রূপান্তরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন ডিজিটাল প্রকল্পকে সমন্বিত কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিক করা হচ্ছে। বর্তমানে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের মধ্যে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান থাকায় নীতিনির্ধারণে সমস্যা তৈরি হয়। অনেক সময় দুই বছর আগের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হয়। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য রিয়েল-টাইম তথ্য ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে সরকার।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বিবিএসের বিপুল পরিমাণ তথ্য গবেষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও সহজভাবে এসব তথ্য ব্যবহার করা যাবে। বিবিএসের প্রকল্পগুলোতে শুধু জরিপ পরিচালনার পরিবর্তে তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ জন্য দেশীয় বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে একটি সমন্বিত ও আন্তঃসংযুক্ত জাতীয় ডেটা সিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়।
শ্রমবাজারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, গবেষণালব্ধ তথ্য সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমবাজারের বাস্তব চিত্র, কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং নীতির প্রভাব নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার তথ্য গোপন বা বিকৃত করার নীতি অনুসরণ করে না। বাস্তব পরিস্থিতি যেমন, তেমনভাবেই তা তুলে ধরতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই প্রয়োজনীয় নীতিগত সংশোধন বা কোর্স কারেকশন করা সম্ভব।
জ্বালানি খাতের প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি সংকট সমাধান অপরিহার্য। এ কারণে আমদানিনির্ভর নীতির পরিবর্তে আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাপেক্সসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। প্রয়োজন হলে বিদেশি দক্ষ প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েও গ্যাস উত্তোলনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে সরকার জমি লিজ দেবে এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ধারিত ট্যারিফে কিনে নেবে বলেও জানান তিনি।
সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন চাকরির পোর্টালের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের চাহিদা, সরবরাহ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাতের প্রভাব তুলে ধরা হয়। গবেষকরা বলেন, সময়োপযোগী ও নির্ভরযোগ্য শ্রমবাজারের তথ্য নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের গবেষক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এএইচ/এফএ




