বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

কবি নজরুল সরকারি কলেজ: এক নামের আড়ালে দেড়শ বছরের ইতিহাস

মাহফুজুর রহমান
প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২১ পিএম

শেয়ার করুন:

কবি নজরুল সরকারি কলেজ: এক নামের আড়ালে দেড়শ বছরের ইতিহাস
কবি নজরুল সরকারি কলেজ

পুরান ঢাকার ব্যস্ত লক্ষ্মীবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা কবি নজরুল সরকারি কলেজ যেন সময়ের এক জীবন্ত দলিল। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠান সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিম শিক্ষার বিকাশ, ঔপনিবেশিক শিক্ষা সংস্কার, পাকিস্তান আমলের শিক্ষা পুনর্গঠন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার। 

প্রায় দেড় শতকের ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন হয়েছে একাধিকবার। প্রতিটি নাম পরিবর্তনের পেছনে ছিল নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা।

আজকের ‘কবি নজরুল সরকারি কলেজ’ একসময় ছিল ‘মোহসিনিয়া মাদরাসা’, পরে ‘ঢাকা মাদরাসা’, ‘ঢাকা হাই মাদরাসা’, ‘ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’ এবং ‘গভর্নমেন্ট ইসলামিয়া কলেজ’। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে নতুন পরিচয় পায় প্রতিষ্ঠানটি।

ব্রিটিশ আমলে মুসলিম শিক্ষার নতুন অধ্যায়

১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্পবেলের সময় মাদরাসা সংস্কার কমিটির সুপারিশে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার আদলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে তিনটি সরকারি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। এর অর্থায়ন করা হয় হাজী মুহাম্মদ মহসীনের দানকৃত ‘মহসীন তহবিল’ থেকে।

ঢাকার এই প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক নাম ছিল মোহসিনিয়া মাদরাসা। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি মানুষের কাছে ঢাকা মাদ্রাসা নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের জন্য প্রথম সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

1

কেন ‘ঢাকা মাদরাসা’?

প্রতিষ্ঠানটির সরকারি নাম ‘মোহসিনিয়া মাদরাসা’ হলেও রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ এটিকে ‘ঢাকা মাদরাসা’ নামে ডাকতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এই নামই সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে এবং সরকারি নথিপত্রেও ‘ঢাকা মাদরাসা’ নামের ব্যবহার বাড়তে থাকে।

আধুনিক শিক্ষার সংযোজন

শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে কেবল ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, ইংরেজি, আরবি, ফারসি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞান শিক্ষারও ব্যবস্থা ছিল। প্রথম অধ্যক্ষ মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আল-ওবায়দীর উদ্যোগে ইংরেজি বিভাগ চালু হয়।

১৮৮১ সালে এখানকার শিক্ষার্থীরা প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। কয়েক বছরের মধ্যেই ইংরেজি বিভাগ এত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ১৮৮৩ সালে মোট ৩৩৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে ২০২ জনই অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগে অধ্যয়ন করছিলেন।

‘ঢাকা হাই মাদরাসা’ নাম কেন?

১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার মাদ্রাসা শিক্ষায় ‘নিউ স্কিম’ চালু করে। এর ফলে ঢাকা মাদরাসাকে উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উন্নীত করা হয় এবং নতুন নাম হয় ঢাকা হাই মাদরাসা। এক বছর পর ১৯১৬ সালে অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগটি আলাদা হয়ে ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে, যা আজও বিদ্যমান।

3

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ইসলামি শিক্ষা নিয়ে উচ্চশিক্ষার চাহিদা তৈরি হয়। সেই প্রয়োজন মেটাতে ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে কলেজে উন্নীত করা হয় এবং নাম রাখা হয় ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। এর উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষার্থী প্রস্তুত করা। এরপর দীর্ঘদিন এটি স্কুল ও কলেজ দুই অংশ নিয়েই পরিচালিত হয়।

পাকিস্তান আমলে ‘গভর্নমেন্ট ইসলামিয়া কলেজ’

১৯৫৮ সালের জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৬২ সালে মাদ্রাসা বিভাগ কার্যত বিলুপ্ত হয়ে সাধারণ শিক্ষায় রূপান্তরিত হয়।

অবশেষে ১৯৬৮ সালে স্কুল অংশ আলাদা হয়ে ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় গঠিত হয়। একই সময় কলেজ অংশের নতুন নাম রাখা হয় ‘গভর্নমেন্ট ইসলামিয়া কলেজ, ঢাকা’। এটি ছিল প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক পরিবর্তনগুলোর একটি।

স্বাধীনতার পর কেন বদলে গেল নাম?

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র তার শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে গুরুত্ব দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালে ‘গভর্নমেন্ট ইসলামিয়া কলেজ’ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় কবি নজরুল সরকারি কলেজ।

এটি শুধু একটি নাম পরিবর্তন ছিল না; বরং পাকিস্তান আমলের ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর নাম থেকে বেরিয়ে এসে বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জাতীয় চেতনাকে ধারণ করার একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত ছিল। একই বছর কলেজটি ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়।

4

কেন নজরুলের নাম?

কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির কবি। স্বাধীনতার পর তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

এই কারণেই পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক এই সরকারি কলেজটির নাম তার নামে রাখা হয়। নামকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়।

নাম পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা

১৮৭৪: মোহসিনিয়া মাদ্রাসা, পরবর্তীকালে: ঢাকা মাদ্রাসা, ১৯১৫: ঢাকা হাই মাদরাসা, ১৯২৩: ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, ১৯৬৮: গভর্নমেন্ট ইসলামিয়া কলেজ, ঢাকা, ১৯৭২–বর্তমান: কবি নজরুল সরকারি কলেজ।

বর্তমানে কবি নজরুল সরকারি কলেজে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের অন্যতম এই প্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষাদানই নয়, বাংলাদেশের মুসলিম শিক্ষার বিকাশ, ব্রিটিশ আমলের শিক্ষা সংস্কার, পাকিস্তান আমলের পুনর্গঠন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এক ধারাবাহিক ইতিহাস বহন করে চলেছে।

এই কারণেই কবি নজরুল সরকারি কলেজের নামের ইতিহাস আসলে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বদলের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা, সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রায় দেড় শতকের বিবর্তনের ইতিহাসও বটে।

5

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অন্যান্য দেশে জাতির প্রতি যাদের প্রকৃত অবদান আছে এবং যারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে দেশের জন্য কাজ করেছেন, তাদের নাম অনুসরণ করা হয়। সরকারের উচিত একটি গাইডলাইন তৈরি করা, যেখানে স্থাপনা বা অবকাঠামোর নামকরণের যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয় অবদান যাচাই করা হবে। এই বিষয়গুলোকে একটি নির্দিষ্ট ছকে আনতে পারলে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা সম্ভব হবে।’

শিক্ষার্থী মাহবুব রশীদ বলেন, ‘কবি নজরুল সরকারি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোহসিনিয়া মাদরাসা থেকে আজকের কবি নজরুল সরকারি কলেজ হয়ে ওঠার ইতিহাস আমাদের গর্বিত করে। এমন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হতে পারাটা সৌভাগ্যের। আমরা চাই, কলেজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি তুলে ধরা হোক এবং এর পুরোনো স্থাপনা ও ঐতিহাসিক দলিলগুলো সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।’

শিক্ষার্থী রায়হান কবীর বলেন, ‘দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা বিস্তারে যে ভূমিকা এই কলেজ পালন করে আসছে, তা সত্যিই অনন্য। স্বাধীনতার পর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে কলেজটির নামকরণ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না, এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতীক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই, এই ঐতিহ্যের পাশাপাশি গবেষণা, আধুনিক শিক্ষা এবং একাডেমিক পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হোক, যাতে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতেও তার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে পার।’

এম/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর