মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ঢাকা

৩৬ দিন কাঁচা মাছ খেয়ে সাগরে ভাসছিলেন বাবা-ছেলে, অবশেষে উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

৩৬ দিন কাঁচা মাছ খেয়ে সাগরে ভাসছিলেন বাবা-ছেলে, অবশেষে উদ্ধার
ছবির বামপাশে সাগর থেকে উদ্ধারকৃত শ্রীলংকার দুই জেলে (সম্পর্কে বাবা-ছেলে)। ডানের ছবিতে তাদের বিকল হওয়া ট্রলারটি

সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন বাবা-ছেলেসহ চারজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক। হঠাৎই বিকল হয়ে যায় তাদের মাছ ধরার ট্রলার। সেখান থেকে দুজন অন্য ট্রলারে ফিরে গেলেও বিকল সেই মাছ ধরার ট্রলারটি রক্ষা করতে সেটি ছেড়ে যাননি বাবা ও ছেলে।

টানা ৩৬দিন শ্রীলঙ্কান সেই মাছ ধরার ট্রলারটি বঙ্গোপসাগরে ভাসতে থাকার পর গত বুধবার বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ট্রলারটিকে দেখতে পায় বাংলাদেশি একটি মাছ ধরা ট্রলার। ওই ট্রলারটি কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের জিয়াউর রহমানের। তিনিসহ ওই ট্রলারটিতে মোট আটজন জেলে ছিলেন।

জিয়াউর রহমান জানান, গত বুধবার রাতে তিনি ওই ট্রলারটিকে দূর থেকে ভাসতে দেখছিলেন। একটু একটু করে যখন কাছে যান তখন তিনি দেখতে পান ট্রলারটিতে দুজন ভিনদেশি নাগরিক। তিনি বলেন, ‘কাছে গিয়ে দেখলাম দুজন মানুষ বসা থেকে উঠতে পর্যন্ত পারতেছে না। তাদের কোনো কথাই বুঝতেছিলাম না। তারা হাতের ইশারায় সাহায্য চাচ্ছিল। আর শুধু বলছিল- শ্রীলঙ্কান, শ্রীলঙ্কান।’

জিয়াউর রহমান জানান, পরে ওই দুজনকে সেখান থেকে তাদের মাছ ধরার ট্রলারের করে উপকূলে নিয়ে আসেন তিনি।

শ্রীলঙ্কার ওই দুই নাগরিক হলেন- এস এইচ চামিন্দা ও তার ছেলে সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিং। তাদের বাড়ি শ্রীলঙ্কার ডেভিনুওয়ারা এলাকার রুরাল হসপিটাল রোডে। সমুদ্রে ভাসতে থাকা ওই দুজন শ্রীলঙ্কান জেলে।

সাউন্ডা হান্নাদিগিপিয়াওয়াটিংয়ের মেয়ে শ্রীলঙ্কা থেকে নিশ্চিত করেছেন, উদ্ধারকৃত ও দুজন নাগরিক সম্পর্কে তার বাবা ও দাদা। তাদের উদ্ধার করায় তিনি বাংলাদেশের জেলে ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান।

বর্তমানে ওই দুজন জেলে কক্সবাজারেই আছেন। তাদের মাছ ধরার সেই বিকল ট্রলারটিও রাখা হয়েছে পুলিশি হেফাজতে। তাদেরকে শিগগিরই ঢাকায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজার মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবদুস সুলতান জানিয়েছেন, এ নিয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার তার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই দুজন জেলেকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে এরই মধ্যে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।

G
বঙ্গোপসাগর থেকে উদ্ধার হওয়া দুই শ্রীলংকান জেলে, সম্পর্কে তারা বাবা-ছেলে

ভাসতে থাকা ট্রলারটি যেভাবে উদ্ধার

বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে প্রায় ১৩শ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে শ্রীলঙ্কার অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়ার কাছাকাছি দেশ দুটির অবস্থান হলেও সরাসরি জলসীমা নেই দুটি দেশের মধ্যে। মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান বঙ্গোপসাগরে তার ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছিলেন।

তিনি জানান, গত বুধবার বঙ্গোপসাগরের গুলিরধার এলাকায় একটি মাছ ধরার ট্রলারকে সাগরে ভাসতে দেখে সেই ট্রলারটির কাছাকাছি যান। কাছে গিয়ে তিনি দেখেন ট্রলারটির ইঞ্জিন বিকল। সেখানেই অসুস্থ অবস্থায় বসে আছেন দুই ব্যক্তি।

জিয়াউর রহমান বলেন, ‘কাছে গিয়ে দেখি ওই দুজন মানুষ বসা থেকে উঠতে পারছিলেন না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম তারা কোথা থেকে আসছে। তারা জানালো, তারা শ্রীলঙ্কার। এর বাইরে তাদের আর কোনো ভাষা আমরা বুঝিনি।’

তিনি জানান, ওই দুজন জেলে তাদেরকে সাহায্যের আকুতি জানান। এক পর্যায়ে তাদেরকে তাদের ট্রলারে উঠিয়ে আনেন তিনি ও তার ট্রলারে থাকা অন্য জেলেরা। তাদের কোনো ভাষাই আমরা বুঝতেছিলাম না। তারা শুধু বার বার দুটি শব্দ বলছিল, নেভি? কোস্টগার্ড।’

জেলে জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, শ্রীলঙ্কান ওই দুই জেলে তাদের মাছ ধরার ট্রলারটি হাতছাড়া করতে চাচ্ছিল না। যে কারণে ওই দুজন জেলেকে তাদের ট্রলারে ওঠানোর পর তাদের মাছ ধরার ট্রলারের সঙ্গে বেঁধেই উপকূলের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।

এরপর প্রায় ১৪ ঘণ্টা ট্রলার চালিয়ে ওই দুজন শ্রীলঙ্কান জেলেকে সঙ্গে নিয়ে উপকূলে পৌছাতে বৃহস্পতিবার সকাল হয়ে যায় বলেও জানান জিয়াউর রহমান।

তারপর কী হলো?

উদ্ধার হওয়া ওই দুই জেলের বরাত দিয়ে ট্রলার মালিক জিয়াউর রহমান জানান, সাগরে ভেসে থাকার একপর্যায়ে যখন তাদের খাবার শেষ হয়ে গিয়েছিল, ওই দুই শ্রীলঙ্কান নাগরিক সাগরের কাঁচা মাছ খেতে বাধ্য হয়েছিলেন। ট্রলারে ওঠার পর ওই দুজনকে বিস্কুট পানিসহ কিছু খাবার দেওয়া হলে সেগুলো খান তারা। একটা পর্যায়ে দুজন তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও করতে চান।

ট্রলার মালিক জিয়াউর রহমান জানান, ওই দুই জেলেকে নিয়ে বাংলাদেশি ট্রলারটি উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছায়। একটা পর্যায়ে যখন মোবাইলে ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের আওতায় আসে, তখন ওই দুই জেলে শ্রীলঙ্কায় থাকা তাদের পরিবারের একটি ফোন নম্বর দেন তার কাছে। সেই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দেওয়ার পর বাবা-ছেলে ওই দুজন জেলে তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং এরপর তারা আশ্বস্তও হন।

জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এরপর আমরা বিষয়টি স্থানীয় থানা ও কোস্টগার্ডকেও জানাই। পরে ওই দুইজন জেলেকে সঙ্গে করে আমার বাসায় নিয়ে যাই। তাদেরকে রাতের খাবার-দাবার দিই। স্থানীয় ডাক্তার ডেকে দেখাই। ডাক্তার তাদের ওষুধ দেয়, সেই ওষুধ তারা খায়।’

ওই রাতে জিয়াউর রহমানের বাসায় থাকা অবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন রাতে ওই দুজন শ্রীলঙ্কান জেলেকে রাতে ওই বাসাতে রাখার অনুরোধ জানান।

মহেশখালী থানার ওসি মো. আবদুস সুলতান বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে আসার পর মূলত তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। যখন তারা আর ট্রলারটি ঠিক করতে পারেনি, তখন সেটি ভাসতে ভাসতে আমাদের এদিকে চলে আসে।’
দোভাষীর মাধ্যমে ওই দুইজন জেলের সঙ্গে কথা বলে ওসি সুলতান আরও জানান, গত ১৯ জুন চারজন শ্রীলঙ্কান জেলে ট্রলার নিয়ে মাছ ধরতে বের হওয়ার পর তাদের নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গিয়েছিল। পরে সেই নৌকাটি বাংলাদেশি একটি ট্রলারের নজরে আসে।

Screenshot_2026-07-28_180536
ছবির বাঁ থেকে দুই নম্বরে বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমান। তিনিই লংকান দুই জেলেকে সাগর থেকে উদ্ধার করেন

শ্রীলঙ্কায় ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ

ওই দুজন শ্রীলঙ্কান নাগরিক একদিন ছিলেন বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমানের বাড়িতে। তারপর মহেশখালী থানা থেকে তাকে ফোন দিয়ে ওই দুজনকে থানায় নিয়ে আসার জন্য বলা হয়। শনিবার তাদের দুজনকে মহেশখালী থানায় নিয়ে যান জিয়াউর রহমান।

পুলিশ জানায়, ওই দুজন জেলে তাদের নিজ দেশের ভাষা ছাড়া অন্য কোন ভাষা বুঝেনও না এবং বলতেও পারেন না। একটা পর্যায়ে পুলিশ কক্সবাজারের একটি হোটেলের দায়িত্বে থাকা একজন শ্রীলঙ্কান নাগরিককে ফোন দিয়ে তাদের থানায় নিয়ে আসেন। যিনি দোভাষী হিসেবে পুরো ঘটনাটি তার কাছ থেকে শোনেন এবং সেটি পুলিশকে ব্যাখ্যা করেন।

একটা পর্যায়ে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি জানায় বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কান দূতাবাসকে।

মহেশখালী থানার ওসি মো. আবদুস সুলতান বলেন, ‘খবর পেয়ে শ্রীলঙ্কার অ্যাম্বাসেডর আমাকে ফোন দেন। আমার সঙ্গে কথা বলার পর আমাদের হেফাজতে থাকা ওই দুজন জেলের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদেরকে আশ্বস্ত করেন যে, তাদের দেশে ফিরিয়ে নেবেন।’

পুলিশ জানায়, দুই শ্রীলংকান নাগরিককে থানা হেফাজত থেকে সমাজসেবা অধিদফতরে রাখার জন্য আদালতের মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। দুয়েকদিনের মধ্যে সমাজ সেবা অধিদফতরের মাধ্যমে তাদেরকে ঢাকায় পাঠানো হবে।

ওসি সুলতান বলেন, ‘আমাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ওই দুজন জেলের পাসপোর্ট ছবি তুলে আমরা শ্রীলঙ্কান অ্যাম্বাসিতে পাঠিয়েছি। এরপর তাদের নামে পাসপোর্ট কিংবা পাস ইস্যু হবে। ট্রাভেল পাসসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষ হলেই তাদের নিজ দেশে ফেরানো কার্যক্রমটি সম্পন্ন হতে পারে।’

যে নৌকা ছেড়ে যেতে চাননি শ্রীলঙ্কান ওই দুই নাগরিক, শেষ পর্যন্ত সেই নৌকাটি আর তার দেশে পাঠানো সম্ভব হবে না বলে জানায় পুলিশ।

পুলিশের পক্ষ থেকে তাদেরকে সেই বিষয়টি জানানোর পর বাবা-ছেলে ওই দুই জেলে জানিয়েছেন, তাদের মাছ ধরার সেই নৌকাটি তারা বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমানকে উপহার দিয়ে যেতে চান।

ওসি সুলতান বলেন, ‘ওরা (শ্রীলঙ্কান দুজন জেলে) আমাকে বলছে, যে আমাদেরকে উদ্ধার করেছে, তাকে আমাদের নৌকাটি গিফট করে দেব। আমরা আপাতত নৌকাটি জব্দ তালিকায় যুক্ত করে আদালতে উপস্থাপন করেছি।’

তিনি জানান, ওই নৌকাটি এখন যদি বাংলাদেশি জেলে তাদের কাছ থেকে গিফট হিসেবে নিতে চান, তাহলে সেটি আদালতের মাধ্যমে সব প্রক্রিয়া শেষ করে নিতে পারেন। তবে আদালতের সব প্রক্রিয়া শেষ করেই করতে হবে।

বাংলাদেশি জেলে জিয়াউর রহমান অবশ্য সেই আগ্রহও দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তাদের জন্য নিঃস্বার্থ উপকার করেছি। তারা যদি ভালবেসে নৌকাটি দিতে চান, আমি সেটি নেব।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর