অনলাইন জুয়ার কাজে ব্যবহৃত ৬ হাজার ৬০০ মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ-নগদ একাউন্ট করা সিমকার্ড জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগ। এ সময় চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানায় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।
গ্রেফতারকৃতরা হলো- মো. আরিফুল ইসলাম রিফাত, আরমান হোসেন জিহাদ, মাসুদ হোসেন, আব্দুল রাব্বী, কৌশিক আহমেদ শুভ ও মশিউর রহমান তারেক।
গ্রেফতারের সময় তাদের কাছ থেকে ৬ হাজার ৬০০টি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্ট-সংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কোম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির অধিক মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।
শফিকুল ইসলাম জানান, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ডিবি অনলাইনে পরিচালিত একাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্মে লেনদেন পরিচালনার জন্য মোবাইল ফাইনানশিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের টঙ্গীর একটি রিসোর্টে অভিযান পরিচালনা করে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় কুমিল্লা সদরের একটি হোটেলে অভিযান পরিচালনা করে আরও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপস পরিচালনার কাজে অনেকগুলো পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে। উল্লেখযোগ্য কিছু পেমেন্ট কোম্পানি হল Pay Kashma, Gopay, Lucky pay, LQ pay, XE pay, Cool pay প্রভৃতি। বাংলাদেশ কেন্দ্রিক জুয়ার সাইটে যেসব পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে তার অধিকাংশই চাইনিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এসব পেমেন্ট কোম্পানির বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় প্রচলিত লেনদেনের মাধ্যম প্রয়োজন হয়। যার দরুণ তারা অনলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে। ব্যাংকের তুলনায় সহজলভ্য এবং দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগে কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পেমেন্ট কোম্পানি এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে থাকে।
তিনি জানান, জুয়ার সাইট এবং অ্যাপস পরিচালনার জন্য সাধারণত এমএফএস এজেন্ট একাউন্ট, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট ও মার্চেন্ট এপিআই ব্যবহার করা হয়। এসব এজেন্ট অ্যাকাউন্টে হওয়া লেনদেন দিনশেষে হিসাব করে প্রাপ্ত লভ্যাংশ এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে এমএফএস পারসোনাল অ্যাকাউন্টে প্রেরণ করা হয়।
এসব পারসোনাল অ্যাকাউণ্টে পাঠানো অর্থ ব্যবহার করে ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম (বাইন্যান্স, বাইবিট, বিটগেট) ব্যবহার করে ক্রিপ্টো ডলার (ইউএসডিটি) ক্রয় করা হয়। পরবর্তীতে পেমেন্ট কোম্পানির পাঠানো ওয়ালেট অ্যাড্রেসে ক্রিপ্টো ডলার পাঠানো হয়।
শফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে জানা যায়, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার সাইট ও অ্যাপ্সসমূহের পেমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার জন্য জন্য প্রায় ২০০টির মত পেমেন্ট কোম্পানি কাজ করে থাকে। এসব পেমেন্ট কোম্পানির দৈনিক লেনদেন কয়েক কোটি টাকার উপরে।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা Gopay পেমেন্ট কোম্পানির হয়ে কাজ করত এবং তাদের দৈনিক লেনদেন ৫ কোটি টাকার উপরে। Gopay কোম্পানিটি চাইনিজ নাগরিকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গ্রেফতারকৃত আসামি চাইনিজ নাগরিক নাথান ওরফে অ্যালিনের (ছদ্মনাম) এজেন্ট হয়ে বাংলাদেশে কাজ করে। এসব চাইনিজ নাগরিকরা একসময় বাংলাদেশে অবস্থান করত, তারা বর্তমানে চায়না থেকে কোম্পানিটি পরিচালনা করে।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বাংলাদেশে পরিচালিত জুয়ার ওয়েবসাইটগুলো এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দৈনিক ১,০০০ কোটি টাকার উপরে লেনদেন করে থাকে। এসব লেনদেন থেকে প্রাপ্ত গ্রস প্রফিট পেমেন্ট কোম্পানিগুলো ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ডলারে কনভার্ট করে ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে গ্রহণ করে থাকে।
তথ্যানুযায়ী, ভাল পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর প্রতিটি দৈনিক ১,০০,০০০ (এক লাখ) ইউএসডিটি ডলারের উপরে পাচার করে। পেমেন্ট কোম্পানির প্রাপ্ত কাজ বাংলাদেশিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে করে। একটি অংশ এমএফএস অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করে, অপর অংশ লভ্যাংশের বাংলাদেশি টাকা ক্রিপ্টো ডলারে কনভার্ট করে থাকে।
তিনি আরও জানান, সংঘবদ্ধ চক্রটির বাংলাদেশ অংশের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত আসামি আরিফুল ইসলাম রিফাত। তার অধীনেই বাকিরা Gopay নামক কোম্পানির হয়ে কাজ করে থাকে।
আরিফের তথ্যমতে, পেমেন্ট কোম্পানিগুলো দৈনিক মোট লেনদেনের ০.২- ১ শতাংশ টাকা তাদেরকে প্রদান করতো। এ টাকার ৫০ শতাংশ টাকা সে তার ভেন্ডরদের দেয়। টাকার ভাগের অংশ ভেন্ডর অর্থাৎ এমএফএস অ্যাকাউন্টের এজেন্ট, ডিএসও, সুপারভাইজার ক্ষেত্র বিশেষে হাউস ম্যানেজার, মালিক এবং এমএফএস কর্তৃপক্ষের লোকজনও পেয়ে থাকে বলে জানা যায়।
উল্লেখ্য, এই টাকার বাইরে এ কাজে জড়িতদের জীবনযাত্রা সংক্রান্ত অন্যান্য সকল খরচ (আবাসন, খাবার, যাতায়াত প্রভৃতি) কোম্পানি সরবরাহ করে থাকে। কিছুদিন আগে ৩০০ ফিটে একটি বিএমডব্লিঊ গাড়ি দুর্ঘটনায় কবলিত হয়েছিল। যে গাড়িটির মালিক আরিফ বলে জানা যায়। তার এর বাইরেও সাদা রঙের একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি রয়েছে। এসব থেকেই তাদের মাসিক আয় সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। উক্ত গাড়িগুলো উদ্ধার এবং ক্রাইমের সাথে জড়িত অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারের জন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
একেএস/এআরএম




