রোববার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আইসিটিতে ১০ লাখ চাকরির লক্ষ্য, বাজেটে প্রস্তুতির ঘাটতি

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬, ১০:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

আইসিটিতে ১০ লাখ চাকরির লক্ষ্য, বাজেটে প্রস্তুতির ঘাটতি
আইসিটিতে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ও বাজেটীয় সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন। ছবি: এআই
  • ফ্রিল্যান্সিংয়ে ৮ লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা
  • আইসিটিতে ২ লাখ প্রত্যক্ষ চাকরির লক্ষ্য
  • উচ্চগতির ইন্টারনেট ও জাতীয় ই-ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনা
  • সরকারি খাতে ৫ লাখের বেশি নিয়োগের লক্ষ্য
  • লক্ষ্য নয়, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ—বিশেষজ্ঞরা

আগামী পাঁচ বছরে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সময়ে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রতিবছর ২০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে, এ উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক কর্মসূচির স্পষ্ট প্রতিফলন প্রস্তাবিত বাজেটে নেই।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে একটি খসড়া কৌশলপত্র তৈরি করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) সম্প্রতি সরকারের অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন–সংক্রান্ত অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকে খসড়াটি উপস্থাপন করে। এতে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করা, অর্থনীতির আকার ৭৪৯ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, আইসিটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের মধ্যে প্রায় ২ লাখ হবে প্রত্যক্ষ। সাইবার নিরাপত্তা, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ও ইন্ডাস্ট্রি ৪.০–সংশ্লিষ্ট খাতে এসব কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বাকি ৮ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে।

 

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সবার জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা, সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফ্রিল্যান্সার ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক লেনদেন সহজ করতে পেপ্যাল সুবিধাসহ জাতীয় ই-ওয়ালেট চালুর পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়াতে স্বল্পমেয়াদি ভাষা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতি বছর ২০ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে ৫ লাখের বেশি জনবল নিয়োগের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

pic

জানা গেছে, সরকারের কর্মসংস্থান পরিকল্পনার বড় অংশ নির্ভর করছে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর। কিন্তু বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। টানা দুই মাস ধরে এ হার ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার অর্থ নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া।

জিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব কিছু পদক্ষেপ রাখা হয়েছে। স্টার্টআপ, তরুণ উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিভিন্ন কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সরকার ৪০০ কোটি টাকার একটি উদ্যোক্তা তহবিল গঠনের ঘোষণাও দিয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগের ওপর টার্নওভার কর অব্যাহতি, ফ্রিল্যান্সারদের উৎসে কর ছাড় এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য করমুক্ত সীমা বহাল রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ঘোষণা করা হলেও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি বাজেটে নেই। জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, আধুনিক কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্ম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। ফলে শুধু কর-সুবিধা বা উদ্যোক্তা তহবিলের মাধ্যমে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন বাস্তবসম্মত হবে না।

সিপিডির মতে, বাজেটে বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর-সুবিধার কিছু উদ্যোগ থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বিত কর্মসূচি, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমবাজার সংস্কার এবং বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে ঘোষিত কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সংকট এখন কর্মসংস্থান। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

pic

প্রবাসী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বাজেটকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেছে সিপিডি। সরকারের লক্ষ্য বছরে ২০ লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বাজেট আগের বছরের তুলনায় কমানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৯৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা কমিয়ে ৮৮০ কোটি টাকা করা হয়েছে। বিদেশে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নতুন উদ্যোগও বাজেটে নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৩৮৯ কোটি টাকা থেকে তা বাড়িয়ে ৪৬৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। তবে জাতীয় বাজেটের তুলনায় এ বরাদ্দের অংশ এখনও অত্যন্ত সীমিত। মোট বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি এ বরাদ্দ দিয়ে দেশের শ্রমবাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে বলে মনে করছে সিপিডি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমঘন শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। তৈরি পোশাক, কৃষিভিত্তিক শিল্প, চামড়া, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন ও সৃজনশীল অর্থনীতিতে বড় আকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাজেটে এসব খাতের জন্য কর্মসংস্থানভিত্তিক বিশেষ প্রণোদনার কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

সিপিডি মনে করে, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও বাজেটের মধ্যে নীতিগত সামঞ্জস্য থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাজেটের পাশাপাশি পৃথক জাতীয় কর্মসংস্থান কৌশল, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, প্রযুক্তিনির্ভর চাকরি সৃষ্টির পরিকল্পনা, নারী ও তরুণদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ এবং বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের কার্যকর রোডম্যাপ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও শিল্পায়নের জন্য বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক। তবে ঘোষিত কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এগুলো যথেষ্ট নয়। কর্মসংস্থানকে বাজেটের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং জবাবদিহিমূলক কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এক কোটি কর্মসংস্থান কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ চাকরি সৃষ্টির মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এএইচ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর