অবৈধ পথে ইউরোপ যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে অনাহার, তৃষ্ণা ও দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ ঘটনায় জড়িত মানব পাচার চক্রের এক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটির মানব পাচার প্রতিরোধ (টিএইচবি) ইউনিট।
বুধবার (১৭ জুন) সিআইডি সদর দফতরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান।
বিজ্ঞাপন
গ্রেফতারকৃতের নাম মোহাম্মদ মিকাইল ইসলাম। তিনি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে।
সংবাদ সম্মেলনে জসীম উদ্দিন খান বলেন, ভূমধ্যসাগরে নিহতদের একজন মাসুম (ছদ্মনাম) এবং গ্রেফতারকৃত মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার আশায় মাসুম মানব পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইউরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তে জানা যায়, মানব পাচারকারী চক্রটি গ্রীসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাসুমের পরিবারের কাছে মোট ১৩ লাখ টাকা দাবি করে। এর মধ্যে বিমানযোগে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রীসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের শর্ত দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, উন্নত জীবনের আশায় পরিবারের সদস্যরা এ প্রস্তাবে সম্মত হন। পরে ঢাকায় ১৭ দিন অবস্থানের পর মাসুমকে অন্যদের সঙ্গে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চক্রের সদস্যদের নির্দেশনা অনুযায়ী গত জানুয়ারিতে একটি ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ টাকা জমা করেন মাসুমের বাবা। কয়েকদিন পর গ্রেফতারকৃত মিকাইল ইসলামের কাছেও নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
‘একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করে আসছিল। বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে পাঠানোর নামে তারা মানব পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে আটকে রেখে অর্থ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাঠানোর ব্যবস্থা করত।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে কয়েক মাস অবস্থানের পর গত ২১ মার্চ ১৮ বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রীসের উদ্দেশে যাত্রা করানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি কয়েকদিন ভূমধ্যসাগরে আটকা পড়ে। প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। টানা কয়েকদিন খাবার ও পানীয় ছাড়া ভাসতে থাকায় তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অনাহার, পানিশূন্যতা ও ক্লান্তিতে একে একে মৃত্যুবরণ করেন অনেকে। নিহতদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন।
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পাচারকারীদের নির্দেশে মৃতদের মরদেহ মাঝসমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, নিহতদের মধ্যে তাদের স্বজন মাসুমও রয়েছেন। গ্রীসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল।
মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় মানব পাচার চক্রের সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে সিলেট বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মানব পাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।
গ্রেফতারকৃতকে পরবর্তী আইনানুগ প্রক্রিয়ার জন্য আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
একেএস/এএস




