বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ঢাকা

পদ্মা ব্যারেজে স্বপ্ন বুনছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০২:৪৬ এএম

শেয়ার করুন:

padma
চলছে পদ্মা ব্যারেজের নির্মাণ কাজ। ফাইল ছবি

বছরের পর বছর ধরে শুষ্ক মৌসুমের আগমন মানেই ছিল রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার চর জিকরী গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষক মোহাম্মদ সবুজ মোল্লার জন্য উদ্বেগের কারণ। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং নদী তীরবর্তী মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় পানির অভাবে তার জীবিকা ব্যাহত হয় এবং স্থানীয় কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। এ বছরও পরিস্থিতির ব্যতিক্রম হয়নি।

সবুজ মোল্লা তার ফেটে যাওয়া শুকনো জমির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সেচের পানির তীব্র সংকটের কারণে আমরা সময়মতো আমাদের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট চাষই করতে পারিনি। শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এত নিচে নেমে যায় যে সাধারণ নলকূপের পাম্প দিয়েও পানি তোলা সম্ভব হয় না।’


বিজ্ঞাপন


তার ও আশপাশের কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় ফসল কাটার পর। পাট জাগ দিতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়, কিন্তু আশপাশের জলাশয়গুলো শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা পাট প্রক্রিয়াজাত করতে পারেননি এবং বড় ধরনের লোকসানের শিকার হয়েছেন।

নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সবুজ মোল্লা স্মরণ করেন, অতীতে তাদের এই দুর্ভোগ লাঘবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো পরে বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। এখন তিনি ও তার গ্রামের মানুষ একটি স্থায়ী সমাধান চান।

তিনি বলেন, ‘এখানে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ হলে সবচেয়ে শুষ্ক মৌসুমেও পানির কোনো সংকট থাকবে না। এটি আমাদের স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।’

সবুজ মোল্লার এই দুর্ভোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গঙ্গা-নির্ভর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষের বাস্তবতা এটি।


বিজ্ঞাপন


এই দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় সরকার সম্প্রতি ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প’ অনুমোদন করেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত সাত বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্পটি চরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপ্লবের আশা জাগিয়েছে।

চর জিকরী বেড়িবাঁধপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সুফুরা বেগম, সাজেদা বেগম ও হাজেরা খাতুন শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটজনিত দৈনন্দিন দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। তারা দ্রুত ব্যারেজ নির্মাণের দাবি জানিয়ে বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাজারো পরিবার উপকৃত হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সারা বছর সেচ সুবিধা নিশ্চিত হলে একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ সম্ভব হবে, যা ভূমিহীন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের জন্য বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

এছাড়া ব্যারেজের খাল ও জলাধারে পানি সংরক্ষণ করা গেলে বাণিজ্যিক মাছ চাষের ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে, যা স্থানীয় তরুণদের জন্য টেকসই জীবিকার নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

পানি সংকট পুরো ভূদৃশ্য ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারাকে আমূল বদলে দিয়েছে। কুষ্টিয়ার ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ ব্রিজের পাশে অবস্থিত বারোদাগ গ্রামের ৫২ বছর বয়সি বিপ্লব মণ্ডল পুরো জীবনই এখানে কাটিয়েছেন।

Techtaranga.com

নদীর সন্তান হিসেবে পরিচিত বিপ্লব মণ্ডল প্রায় ৪০ বছর ধরে পদ্মা নদীতে মাছ ধরা, নৌকা চালানো এবং বালু ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার শৈশবে এই নদীর ঘাটে পানির গভীরতা ছিল প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০ ফুট। আজ অতিরিক্ত পলি জমা ও পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গভীরতা নেমে এসেছে মাত্র ২০ ফুটে।’

এই ভয়াবহ পানির স্তর হ্রাস স্থানীয় মৎস্যসম্পদকে ধ্বংস করেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী জেলেরা প্রায় মাছ শূন্য অবস্থায় পড়েছেন। বিপ্লব মণ্ডল জানান, খুলনা বিভাগের বড় অংশের ধান চাষ পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল, যা এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় আমরা চরম দুর্ভোগ ও দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি।’ তার মতে, ব্যারেজের মাধ্যমে সুপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই অঞ্চলকে মরুকরণ থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডাবলিউডিবি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। রাজবাড়ীর পাংশা পয়েন্টে ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডারস্লুইস গেট, ফিশ পাস এবং ন্যাভিগেশন লক।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখা এবং গঙ্গার প্রধান শাখা নদীগুলো—গড়াই, মধুমতী, চন্দনা ও হিসনা নদীতে নিয়মিত পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা। বিডাবলিউডিবি কর্মকর্তাদের মতে, নদীর পানির স্তর প্রায় ১০ মিটার ধরে রাখা গেলে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্পের চাহিদা পূরণ হবে এবং এর কার্যকর আওতা ৫৫ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৯৫ হাজার হেক্টরে উন্নীত হবে।

সব মিলিয়ে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ উন্নত পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা হ্রাসের মাধ্যমে উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে প্রকল্পটি নিয়ে পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বড় আকারের নদী অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

সাবেক পানি সম্পদ সচিব ও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আখতার হোসেন সতর্ক করে বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন লবণাক্ততা অনুপ্রবেশের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে খুলনা অঞ্চলের কিছু অংশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে। তিনি ব্যারেজকে সমর্থন করলেও এর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, বড় অবকাঠামো নদীর পলি জমা ও পানির গুণমানের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করে, তাই উন্নত কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে ব্যাপক প্রভাব মূল্যায়ন করা উচিত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির (আইএফসি) বাংলাদেশ-এর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক জসিম উদ্দিন আহমদ নদীর পলিতে ভারী ধাতু দূষণের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, পানি বণ্টন সমস্যার পাশাপাশি পানির মান ও দূষণ নিয়েও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা করা উচিত। এ ক্ষেত্রে তিনি জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের রাইন নদী ব্যবস্থাপনার উদাহরণ তুলে ধরেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান আনসারী বলেন, পদ্মা ব্যারেজ বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শুষ্ক মৌসুমের পানি সংকটের ঐতিহাসিক সমাধান। এটি ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে ২.৮৮ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সেচ দেবে, ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা কমাবে এবং মৃতপ্রায় নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে।

তিনি আরও বলেন, ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকার সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নের এই প্রকল্পটি ২০৩১ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন হলে জিডিপি ০.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে নদীভাঙন থেকে রক্ষা করবে এবং সুন্দরবনকে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।

আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান বলেন, গঙ্গার পানি বণ্টন সমস্যা সমাধান না হলে বিষয়টি জাতিসংঘে নেওয়া উচিত।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের চোখ এখন এই প্রকল্পের দিকে—যেখানে আশা করা হচ্ছে, ব্যারেজ নদী ফিরিয়ে আনবে, ভূমি রক্ষা করবে এবং ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করবে। সূত্র: বাসস

এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর