বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ঢাকা

চিকিৎসকদের ‘চামার’ মন্তব্য: সাংবাদিক মাসুদ কামালকে ডা. হিমুর জবাব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০ জুন ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

চিকিৎসকদের ‘চামার’ মন্তব্য: সাংবাদিক মাসুদ কামালকে ডা. হিমুর জবাব

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সম্প্রতি এক টকশোতে আলোচনার সময় তিনি চিকিৎসকদের ‘চামার’ ও ‘ওষুধ কোম্পানির ক্যানভাসার’ বলে মন্তব্য করেন। বক্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির হিমু ফেসবুকে পরপর দুটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে চিকিৎসকদের মানবিক অবদান, পেশাগত ত্যাগ এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সেবা দিয়ে যাওয়ার নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।

টকশোতে মাসুদ কামাল বলেন, ‘ডাক্তারদের মতো চামার দ্বিতীয় কোনো শ্রেণি এই দেশে আর নেই। ডাক্তাররা কখনও রোগীর দিকে তাকিয়ে ভাবে না যে, এই রোগীর ভাত খাওয়ার টাকা নেই, সে ৩০০ টাকার ওষুধ কীভাবে কিনবে? আমাদের এই ডাক্তাররা হলেন ওষুধ কোম্পানির ক্যানভাসার।’


বিজ্ঞাপন


এ বক্তব্যের জবাবে ডা. হিমু ‘এক চামারের ও ইতরের গল্প’ এবং ‘এক চামারের ভিক্ষাবৃত্তি’ শিরোনামে দুটি পোস্ট প্রকাশ করেন। পোস্ট দুটিতে তিনি চিকিৎসক জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, দেশের অসংখ্য চিকিৎসক ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নীরবে রোগীদের পাশে দাঁড়ান। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নিজস্ব অর্থে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি আনার উদ্যোগ- এসব বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি চিকিৎসকদের প্রতি উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুন: সরকারের কাছে সব অধ্যাদেশের ব্যাখ্যা চান মাসুদ কামাল

প্রথম পোস্টে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় এক দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রোগীটির পেটে প্রচুর পানি জমেছিল এবং দীর্ঘদিনেও রোগ নির্ণয় করা যাচ্ছিল না। একের পর এক পরীক্ষা প্রয়োজন হলেও রোগীর স্বজনদের আর্থিক সামর্থ্য শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে বিভাগের তৎকালীন প্রধান অধ্যাপক নিজাম উদ্দিনের সহায়তায় বিভাগীয় তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত রোগ নির্ণয় সম্ভব হয়। ডা. হিমু লিখেছেন, ওই রোগীর হাসিমাখা মুখ আজও তাঁর স্মৃতিতে ভাসে।

একই পোস্টে তিনি কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কামরুল ইসলামের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোগীকে বিনা খরচে কিডনি প্রতিস্থাপনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এছাড়া একজন খ্যাতিমান হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক চিকিৎসক নিজেদের অর্থ ব্যয় করেও অসচ্ছল রোগীদের এনজিওগ্রাম, স্টেন্ট প্রতিস্থাপনসহ নানা চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করে থাকেন।


বিজ্ঞাপন


নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন ডা. হিমু। তিনি লিখেছেন, ব্যক্তিগত চেম্বারে অনেক সময় অসহায় রোগীদের কাছ থেকে ফি নেন না বা কমিয়ে দেন। তাঁর দাবি, দেশের অসংখ্য চিকিৎসক নীরবে রোগীদের পাশে দাঁড়ান, কিন্তু সেসব গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে।

আরও পড়ুন: সিন্ডিকেট-দুর্নীতি চলবে না, কারও চাপে কাজ হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দ্বিতীয় পোস্টে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের কাজের স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে ধরেন। চীনের একটি মেডিকেল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও কাজ করার সক্ষমতা বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

জার্মানি, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ওমানের চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেশে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে দেশের রোগীরা তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে পারেন। একই সঙ্গে তরুণ চিকিৎসকদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের পথও উন্মুক্ত হচ্ছে।

ডা. হিমু তাঁর পোস্টে বলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পুরো চিকিৎসক সমাজকে এককভাবে দায়ী করা বা অবমাননাকর ভাষায় আক্রমণ করা বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে, চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এক বিবৃতিতে মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তা প্রত্যাহার এবং চিকিৎসক সমাজের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মাসুদ কামালের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে চিকিৎসকরা বক্তব্যটিকে তাদের পেশার প্রতি অবমাননা হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন সমস্যা ও রোগীদের ভোগান্তির বিষয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর