উদ্ভাবনী সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয় উদ্যোগের মাধ্যমে চলনবিল অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার-২০২৫ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে।
বুধবার (১০ জুন) জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থাটির ঢাকা শাখা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
২০২৫ সালে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা) এবং মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারে ভূষিত হয়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের জন্য উদ্ভাবনী সাক্ষরতা উদ্যোগ বাস্তবায়নের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার প্রদান করে আসছে ইউনেস্কো।
এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ফ্রেন্ডশিপ এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ২০১৩ সালে এই মর্যাদাপূর্ণ ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার অর্জন করেছিল। এবার তৃতীয়বারের মতো পুরস্কার প্রহণ করল বাংলাদেশ।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশনের (বিএনএফই) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবব্রত চক্রবর্তী এবং ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের (ক্যাম্পে) নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের সূচনা পর্বে ইউনেস্কো ঢাকার শিক্ষা বিভাগের প্রধান নোরিহিদে ফুরুকাওয়া ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ এবং এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার প্রসার’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দিতে উদ্ভাবনী উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষা পৌঁছে দিতে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের কার্যক্রম শুধু শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তিই বাড়ায় না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সহায়তা করে। সরকার এ ধরনের কার্যকর উদ্যোগকে উৎসাহিত ও সম্প্রসারণে কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ সাক্ষরতার রূপান্তরমূলক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, সাক্ষরতা কেবল পড়তে ও লিখতে শেখার বিষয় নয়; এটি মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জীবনের সুযোগগুলো কাজে লাগানো এবং সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সক্ষমতা দেয়। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার ভাসমান বিদ্যালয় প্রকল্প একটি ব্যতিক্রমধর্মী ও স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত শিক্ষা ব্যবস্থা, যা বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমি অঞ্চল চলনবিলের জলপথে শিক্ষা সহায়তা দিয়েছে। দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় শিশুদের জন্য নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন, বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন নদী-খাল উপচে পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে শ্রেণিকক্ষের সকল সুবিধাসম্পন্ন নৌকাভিত্তিক ভাসমান বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
স্থানীয় নৌকা নির্মাণ জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নির্মিত প্রতিটি নৌকায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমানে সিধুলাই ৫৬টি নৌকা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২৬টি ভাসমান শ্রেণিকক্ষ, ১০টি ভাসমান গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার ল্যাব এবং ৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি নৌকাগুলো স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা এবং পরিবহন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক স্থপতি মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং অংশগ্রহণকে ভিত্তি করেই টেকসই সমাধান গড়ে ওঠে। আমাদের বিশ্বাস, যে সমস্যার মুখোমুখি একটি সম্প্রদায় প্রতিদিন হয়, সেই সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর সমাধানের ধারণাও প্রায়শই সেই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেই আসে। এই স্বীকৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা।”
১৯৬৭ সাল থেকে সাক্ষরতা ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার দিয়ে আসছে। চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায় প্রদত্ত ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার।
প্রতি বছর কার্যকর সাক্ষরতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাপ্তবয়স্ক ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের শিক্ষায় সহায়তার জন্য বিশ্বের তিনটি প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
এএম/এএইচ




