কেউ এসেছেন খালের দখলমুক্তির দাবি নিয়ে, কেউ আবার আবদার করেছেন নিজ মহল্লায় একটি ছোট্ট খেলার মাঠের জন্য। বেহাল রাস্তা, জলাবদ্ধতা আর মশার উপদ্রবের মতো নিত্যদিনের চিরচেনা অভাব, অভিযোগ আর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ; বাদ যায়নি নানা আবদারও। এমন চিত্র দেখা গেছে নাগরিকদের সমস্যার কথা জানা এবং সেবা কার্যক্রম তরান্বিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গণশুনানিতে।
সোমবার (৮ জুন) বিকেলে রাজধানীর বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির অডিটোরিয়ামে অঞ্চল ২ ও ৫ এলাকায় দ্বিতীয় গণশুনানি করেছে ডিএসসিসি।
বিজ্ঞাপন
গণশুনানিতে অঞ্চল-২ এর খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদাপাড়া, কমলাপুর, শাহজাহানপুর ও মতিঝিল এবং অঞ্চল-৫ এর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, স্বামীবাগ, গোপীবাগ, নারিন্দা, দয়াগঞ্জ, টিকাটুলী, ধলপুর, মান্ডা, মুগদা ও বাসাবোর আংশিক এলাকার নাগরিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে নগর কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের নানা অভাব, অভিযোগ ও ক্ষোভের কথা জানান। পাশাপাশি নানা আবদার তুলে ধরেন নাগরিকরা। সেই সঙ্গে ঢাকাকে তিলোত্তমা নগরী গড়ে তুলতে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তারা।
অন্যদিকে সিটি করপোরেশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যেসব অভিযোগ বা সমস্যা নাগরিকরা তুলে ধরেছেন সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে। কিছু সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধানে নির্দেশও দেওয়া হয়।
বাসিন্দাদের যত অভিযোগ-অনুযোগ
বিজ্ঞাপন
গণশুনানিতে বাসাবো খালের বেহাল দশার বর্ণনা দেন খিলগাঁও তালতলা এলাকার বাসিন্দা হুমায়ন কবীর। উন্মুক্ত প্রশ্নে তিনি বলেন, খালের কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু খালটি ময়লায় ভরে আছে। এতে এই এলাকায় অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আর খালের ময়লা পানিতে মশা জন্ম নিচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ৫১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা জুয়েল বলেন, ওই এলাকা একটু নিচু এলাকা। তাই একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হয়ে যায়। দূষিত পানির কারণে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। ওষুধ দেওয়া হলে মশা কিছুক্ষণ চিত ও কাত হয়ে পড়ে থাকে। কিন্তু আবার মশার উৎপাত বেড়ে যায়।
মুগদা এলাকার মসজিদের ইমাম হাফেজ তোফাজ্জল হোসেন। তিনি ৭২নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি বলেন, আমার এলাকায় ছিনতাই, মাদক ও জুয়ার আড্ডা বসছে। এতে বাড়িওয়ালারা সব সময় ভয়ে থাকেন। আমাদের ওই গলিতে প্রশাসনও ঢোকে না। ওখান থেকে পুলিশ টাকা খায় তাই যায় না বলে শুনি।
মাদারটেকে একটি কলেজের শিক্ষক আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, বৃষ্টি হলে কলেজ মাঠে পানি জমে যায়। এতে খেলাধুলা করার কোনো সুযোগ নাই।
নারী নেত্রী ইয়াসিন রাব্বানি বলেন, ১৯৬০ সাল থেকে এই এলাকায় থাকি। এখানকার মশা ও রাস্তার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ড্রেনেজ সিস্টেমও খুব খারাপ।
তিনি বালুর মাঠ হাটার উপযোগী করা ও খেলার মাঠগুলো নারীবান্ধব করার আহ্বান জানান।
৭২নং ওয়ার্ডের জামায়াতের এক নেতা বলেন, মুগদা ও মান্ডা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সমস্যা। মা ও বোনেরা সারারাত জেগে ভোরে কিছুক্ষণের জন্য একটু গ্যাস পেলে রান্না করেন।
৫১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহবুবর রহমান হেলাল বলেন, মান্ডার প্রধান সমস্যা গ্যাসের সমস্যা। আমরা গ্যাসের অফিসে বহুবার গেছি। আন্দোলন করেছি কিন্তু সমাধান হচ্ছে না।
জামায়াতের আরেক নেতা খিলগাঁও কবরস্থানের পাশে একটি সড়ক নির্মাণ, মসজিদ উন্নয়ন এবং বর্জ্য অপসারণসহ নানা দাবি জানান।
নারী নেত্রী তাসনিম জারার প্রতিনিধি হিসেবে এসেছিলেন জয়নুল আবেদিন। তিনি বলেন, রাস্তায় অযাচিত স্পিড-ব্রেকার দেওয়া হচ্ছে। এতে রোগীদের সমস্যা হচ্ছে।
একজন মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুগদা হাসপাতালে দালাল চক্র তৈরি হয়েছে। এ কারণে চিকিৎসা সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।
৩নং ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা বলেন, সেখানকার কোনো সড়কই ভালো না। রাস্তার লাইটে সমস্যা, ফলে চুরি-ডাকাতি বেড়েছে।
কাইয়ুম নামের এক বাসিন্দা বলেন, রাত ১২-১টায় বিকট শব্দে মটরসাইকেল চালায় কিশোররা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে আতশবাজি ফাটায়। এতে হার্টের রোগীরা সমস্যায় পড়ছেন।
কদমতলার এক বাসিন্দা বলেন, সেখানে ময়লার কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মাদক ও সন্ত্রাসীদের আস্তানা তৈরি হয়েছে। আমরা সব জায়গায় অভিযোগ দিয়েছি। পরিবেশ অধিদফতর এসেছে। থানার লোকজন এসেছে। কিন্তু সিটি করপোরেশন আসেনি।
গ্রিন মডেল টাউনের নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব রহমান বলেন, ওখানে কোনো নাগরিক সুবিধা নাই। ল্যান্ডফিলের কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। মশার কারণে বসবাস করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
উত্তর মুগদার ঝিলপাড় এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, মুগদা হাসপাতালের আশপাশের প্রত্যেকটি রাস্তার খুবই করুণ দশা। রিকশা যেতে পারে না।
হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, হাসপালের বাথরুমে যাওয়া যায় না। পরিষ্কার করা হয় না।
এসময় ১০নং ওয়ার্ডে দুটি রাস্তার জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান স্থানীয় এক বাসিন্দা।
একজন নারী বলেন, দক্ষিণ বনশ্রীতে রাস্তার লাইট ঠিক নাই। চুরি হচ্ছে। গত পরশুদিনও চোর ধরেছি।
এক বাসিন্দা বলেন, বাসাবো-মাদারটেক রোড হকাররা দখল করে রেখেছে।
৭৩নং ওয়ার্ডের জামায়াতের এক কর্মী বলেন, কুসুমবাগে কোনো ওয়াকওয়ে নেই। বাচ্চা ও বয়স্করা হাঁটতে পারে না।
৫৩নং ওয়ার্ডের এক বাসিন্দা বলেন, সবচেয়ে অবহেলিত আমাদের ওয়ার্ড। ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুব খারাপ। সামান্য বৃষ্টি হলে এলাকা ডুবে যায়। খেলার মাঠ নেই। স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টারসহ কোনো কিছুই নেই।
মাহবুবুর রহমান শাহিন নামের এক বাসিন্দা বলেন, বারো মসজিদ থেকে ঝিলপাড় পর্যন্ত রাস্তা কাজ বন্ধ হয়ে আছে। এতে মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে। মতিঝিল থেকে মুগদার রাস্তায় লাইট জলে না, এতে পথচারীরা আতঙ্কে থাকেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, কমলাপুর স্টেডিয়ামের পাশের রাস্তাটা বন্ধ হয়ে গেছে। এটা খুলে দিলে ওই এলাকার মানুষের যাতায়াতের সুবিধা হয়। তাছাড়া খালটার কারণে মশা বেড়ে গেছে। এটা পরিষ্কার করা ও পাশে গাছ লাগানো দরকার।
একজন আইনজীবী বলেন, ৭৩নং ওয়ার্ডের সড়কে কাটাকাটি হচ্ছে। এতে জনদুর্ভোগ বাড়ছে। তাই কাজের গতিশীলতা দরকার।
মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, প্রথম লেনে ৫ মিনিটের বৃষ্টিতে বাসায় পানি উঠে যায়। এখানে আউটলেট নাই।
খিলগাঁও থানা মহিলা দলের মৌসুমী কবীর বলেন, ১৭-২৩নং ওয়ার্ডের প্রত্যকটা গলি সব সময় খারাপ থাকে। এখানে বৃষ্টি লাগে না। এমনিই জলাবদ্ধতা থাকে।
নন্দিপাড়ার বাসিন্দা ও খেলোয়ার মশিউর রহমান বলেন, ওই এলাকার প্রধান সমস্যা মশা ও জলাবদ্ধতা। খালের কাজটা দ্রুত করার দাবি জানাই।
দ্রুত সময়ে সমাধানের আশ্বাস
গণশুনানিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসসিসি প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেন, আমাদের ইঞ্জিনিয়ার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নোট নিয়েছেন। এগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা হবে।
নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা সিটি করপোরেশনের কাজ দেখবেন, আপনারা তদারকি করবেন। সঠিকভাবে কাজ না হলে তা জানাবেন।
দুই বছরের মধ্যে শহর পাল্টে দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, ঢাকা-৯ মডেল হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
আবদুস সালাম বলেন, নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সিটি করপোরেশনের মূল দায়িত্ব হলেও এতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্জ্য অপসারণ, সড়ক বাতি নিশ্চিত করা, মশা নিধন ও রাস্তাঘাট সংস্কারে প্রশাসন কাজ করছে। তবে শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর না করে জনগণকে সচেতন হতে হবে। সিটি করপোরেশন ও জনগণের দায়িত্ব ৫০-৫০ ভাগে ভাগ করে নিতে হবে।
জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বৃষ্টি হলেই পানি জমার সমস্যাটি নিরসনে কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সেবা প্রদানে অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রশাসক বলেন, এতদিন অনেক ক্ষেত্রে অবহেলা ও দায়িত্বে শিথিলতা ছিল, এখন আর সেই সুযোগ নেই। জাতীয় সনদপত্র, জন্মনিবন্ধন, মশা নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্ট্রিট লাইটের মতো মৌলিক সেবাগুলোতে অবহেলা করলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, জনগণই রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস। জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রে জনগণের জানার অধিকার রয়েছে কোথায় উন্নয়ন হচ্ছে, কীভাবে অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী। এই স্বচ্ছতাই সুশাসনের ভিত্তি।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা-৯ আসনে ইতোমধ্যে সড়ক উন্নয়ন, আরসিসি ঢালাই, ড্রেনেজ ও পাইপলাইন স্থাপনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং অনেক প্রকল্প চলমান রয়েছে। একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে নাগরিক সচেতনতা ও সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
ডিএসসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এমন অনুষ্ঠান আগে হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। এই উদ্যোগটি নিয়েছেন প্রশাসক সাহেব।
তিনি আরও বলেন, আমরা ৩২টি সেবা নিয়ে কাজ করি। তবে আজকে ৩টি বিষয় তথা পরিচ্ছন্নতা, মশা নিয়ন্ত্রণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সমস্যা আমরা উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চাই। পর্যায়ক্রমে বাকি অঞ্চলেও এমন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে।
ডিএসসিসি’র প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, কাল সকাল থেকেই এই এলাকায় কাজ শুরু হবে। বর্জ্য বিভাগ থেকে যা যা করার আমরা করব। ড্রেনেজ পরিষ্কার, খাল পরিষ্কার প্রভৃতি। যদি কোথাও কাজ না হয় তাহলে আমাকে জানাবেন। এক ঘণ্টার মধ্যে সেটি করা হবে।
এরআগে গতকাল রোববার ধানমন্ডিতে প্রথমদিনের গণশুনানি হয়। পর্যায়ক্রমে ১০টি অঞ্চলেই এই ধরনের গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এএম/এফএ




