২২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ তথ্য জানিয়েছেন তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ফুটবল টুর্নামেন্টের মাধ্যমে শৃঙ্খলা, দলগত কাজ ও সৃজনশীলতার শিক্ষা অর্জন করছে। আমরা তাদের মধ্যে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে চাই। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ জুন জাতীয় আর্মি স্টেডিয়ামে এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হবে।
সোমবার (৮ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র।
বিজ্ঞাপন
মাহদী আমিন বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট পরিচালনা করছি, যা বালক ও বালিকাদের জন্য পৃথকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রতিযোগিতা গত ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। হয়তো আপনারা অনেকেই বিষয়টি সেভাবে লক্ষ করেননি, কিন্তু এখানে একটি বড় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ১১ লাখের বেশি ছাত্রী এবং ১১ লাখের বেশি ছাত্র, অর্থাৎ মোট ২২ লাখেরও বেশি কোমলমতি শিক্ষার্থী এই ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে। নিজ নিজ বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে তারা ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল প্রতিযোগিতাগুলো গুরুত্বসহকারে প্রচারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে আমাদের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি অনুপ্রাণিত হবে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত খেলাগুলোতে গিয়ে আমরা দেখেছি, সারা বাংলাদেশ থেকে উঠে আসা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা গভীর আবেগ, আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে অংশগ্রহণ করছে। সুতরাং, তাদের এই প্রচেষ্টাকে আরও উৎসাহিত করার জন্য গণমাধ্যমের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক এই উপদেষ্টা বলেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পার্থক্য হলো-প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে চান, যেখানে আমরা সৃজনশীলতা, মেধা ও মননশীলতাকে মূল্যায়ন করতে পারি। পুথিগত শিক্ষা বা সার্টিফিকেটের পাশাপাশি কীভাবে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া যায়, সে বিষয়েও আমরা গুরুত্বারোপ করছি। আমরা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে আমাদের আগামীর তরুণ প্রজন্ম সুদক্ষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে, নৈতিক শিক্ষায় সমৃদ্ধ হবে এবং বাস্তব জীবনে আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা কিংবা চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করবে।
এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ধারাবাহিকভাবে বেশকিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, এর মধ্যে কয়েকটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বেশ কিছু চলমান রয়েছে এবং সামনের দিনগুলোতে আরও কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
উদাহরণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিনটি অধিদফতর রয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর। এই তিনটি অধিদফতরের মাধ্যমে আমরা সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে শিক্ষার সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছি। এসব প্রতিযোগিতা শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়; বরং দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা হচ্ছে।
মাহদী আমিন বলেন, দ্বিতীয় যে উদ্যোগটি আমাদের রয়েছে, তা হলো মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে দেশব্যাপী ‘স্টার্ট-আপ সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং’ কর্মসূচি। এখানে দেশের প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কীভাবে ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন করবে, দলগতভাবে কাজ করবে এবং উদ্ভাবনী চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেবে, সে বিষয়ে কাজ করবে। প্রতিটি দলে তিনজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুজন শিক্ষক পরামর্শক হিসেবে থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যার উদ্ভাবনী সমাধান বের করে আনা। যারা উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে এবং কার্যকর আইডিয়া উপস্থাপন করবে, তাদের জন্য আমরা সিড ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থা করতে চাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, এই প্রতিযোগিতাও আঞ্চলিক পর্যায় থেকে শুরু হয়ে জাতীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে। ইনশাআল্লাহ চূড়ান্ত পর্বে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের সেরা ১০০টি দলকে ঢাকায় জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা হবে। প্রধানমন্ত্রী এ ক্ষেত্রেও সদয় সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। ইনশাআল্লাহ চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিতব্য চূড়ান্ত পর্বে সেরা ১০টি দলকে ট্রফি প্রদান করা হবে। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী শিক্ষকদের জন্য ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক পুরস্কার’ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘উদ্ভাবনী মেধাবী শিক্ষার্থী পুরস্কার’ প্রদান করা হবে।
মাহদী আমিন বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো আগামী বাংলাদেশের নির্মাণে যারা কারিগর হবে, সেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে থেকে উদ্ভাবনী নেতৃত্ব তৈরি করা। যারা ভালো আইডিয়া নিয়ে আসবে, আমরা তাদের অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করব। তাদের উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করার পরিবেশ তৈরি করব। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা তৈরি হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে আমরা এ মাসের শেষ দিকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সপ্তাহ আয়োজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। এর আওতায় জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধাপে ধাপে দক্ষতা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ক্যারিয়ার সেবা ও ক্যারিয়ার ফেয়ার নিশ্চিত করতে চাই এবং অন-স্পট চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই। চূড়ান্ত পর্বে ঢাকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অন-স্পট সাক্ষাৎকার গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলো সেখানে অংশগ্রহণ করবে এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়োগ দেবে। এর মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে চাই যে, কারিগরি শিক্ষা একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে এবং এটিকে মূলধারার শিক্ষার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
মাহদী আমিন বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও আমরা এমন একটি কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যা হবে সম্মানজনক এবং যেখানে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এ কারণে আমরা দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষাকে আরও প্রসারিত করতে চাই। আমাদের সৃজনশীল শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কুইজ, পোস্টার ডিজাইন ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে চাই। তাদের সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতাও আয়োজন করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, কারিগরি ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যেন উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সেজন্য তাদের উদ্ভাবনী ধারণাগুলোকে আমরা অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করব। একই সঙ্গে আমাদের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয় গড়ে তুলতে চাই। এর পাশাপাশি, দেশব্যাপী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষার্থীর মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। ইনশাআল্লাহ বৃক্ষরোপণের মৌসুমে আমরা যেমন ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও বৃক্ষরোপণে গুরুত্ব দেব, তেমনি সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করব এবং তাদের মেধা ও মননশীলতাকে কাজে লাগাব।
বিইউ/এফএ




