ভোটার তালিকার শুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে আবারও উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একাধিকবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) কাছে থাকা রোহিঙ্গা ডাটাবেইজ ব্যবহারের চেষ্টা করেও সফল না হওয়ায় এবার সরাসরি ডাটাবেইজ নয়, বরং অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ইউএনএইচসিআরকে চিঠি দিচ্ছে ইসি। রোহিঙ্গা ভোটার শনাক্ত ও প্রতিরোধে এটিকে নতুন কৌশল হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
ইসি সূত্র জানায়, গত বছর রোহিঙ্গাদের সার্ভার ইসির কাছে দেওয়ার সম্মতি দিয়েছিল জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর)। তবে এ সার্ভার ইসির কাছে থাকবে, নাকি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয়ে থাকবে তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের সার্ভারটি আর ইসি পায়নি। আর এতেই সব কার্যক্রম ঝুলে যায়।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি ভোটার তালিকায় কয়েকজন রোহিঙ্গা শনাক্তের কথা উল্লেখ করে ইসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কয়েক দিন আগে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক কক্সবাজার গিয়েছিলেন রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করতে। সেখানে গিয়ে তিনি সব পর্যবেক্ষণ করে এসে আমাদের নির্দেশনা দেন সার্ভার নয়, অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) চেয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারকে একটি চিঠি দেওয়ার জন্য। আমরা তা তৈরি করছি।
এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, রোহিঙ্গা সার্ভার ব্যবহারে আমরা আবারও জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারকে (ইউএনএইচসিআর) চিঠি দিচ্ছি।
গত বছর রোহিঙ্গাদের সার্ভার নিয়ে সবকিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর কেন তা পাওয়া গেল না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো জটিলতা ছিল হয়ত, এ কারণে আমরা পাইনি। তাই আবার আমরা তাদের চিঠি দিচ্ছি।
বিজ্ঞাপন
গত কয়েক দশক ধরেই নানা সময় রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসে। তবে ২০১৭ সালের আগস্টে গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। এ বিশাল জনগোষ্ঠী নিয়ে বর্তমানে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে রোহিঙ্গাদের ঘিরে সারাদেশে যেমন অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে, তেমনি অনৈতিকভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র-এনআইডি পাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে রোহিঙ্গারা। ইতোমধ্যে অনেক রোহিঙ্গা এনআইডি হাতিয়ে নিয়ে বিদেশেও চলে গেছে। তবে কমিশন নানা কৌশলে এসব রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করে এনআইডি লক করে দিচ্ছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৬৪ জন।
জানা যায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের নাগরিকদের এনআইডি সেবা সহজ করতে এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন (এনআইডি) কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে তিনটি ক্যাটাগরিতে নাগরিকদের আবেদন ভাগ করে নিয়ে নিষ্পত্তি করে থাকে সংস্থাটি। কেউ আবেদন করলে প্রথমে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ফেলার কথা বলা হয়েছে। দুটি ক্যাটাগরির কোনোটিতেই চিহ্নিত না করা গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আবেদন ‘সি’ ক্যাটাগরি বা বিশেষ কমিটির কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে। আবার কেউ আবেদন করলেই যেন রোহিঙ্গা সন্দেহ না করা হয়, সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয় নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, যাদের এসএসসি/সমমান বা তদূর্ধ্ব সনদ আছে এবং পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে তথ্যের মিল থাকবে তারাই ‘এ’ ক্যাটাগরিতে পড়বেন। আবার এসএসসি/সমমান বা তদূর্ধ্ব সনদ থাকবে না, কিন্তু অনলাইন জন্ম সনদ ও পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে তথ্যের মিল থাকবে, তারা ‘বি’ ক্যাটাগরিতে পড়বেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যেসব আবেদনে সন্দেহ হবে, সে আবেদনগুলো ‘সি’ ক্যাটাগরি বা বিশেষ কমিটির কাছে চলে যাবে।
জানা যায়, বিশেষ এলাকার কমিটিতে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত দেশের চার জেলা—চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও কক্সবাজারের ৩২টি উপজেলার সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার আহ্বায়ক, সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন কর্মকর্তা সদস্য সচিব এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী কমিশনার (ভূমি), অফিসার ইনচার্জ (এসআই/এএসআই পদমর্যাদার কম নয়), উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), বিজিবির প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়), জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়) এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রতিনিধি (কর্মকর্তার নিচে নয়) সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।
এমএইচএইচ/জেবি




