কেউ এসেছেন বর্জ্যের অভিযোগ জানাতে। কেউবা এসেছেন জলাবদ্ধতার সমস্যার কথা জানাতে। মশা, সড়ক, ফুটপাতসহ নানা অভিযোগ নাগরিকরা সরাসরি জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসককে। প্রশাসকও তাৎক্ষণিকভাবে এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কমকর্তাকে নির্দেশনা প্রদান ও পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন ডিএসসিসি আয়োজিত গণশুনানিতে।
রোববার (৭ জুন) রাজধানী ধানমন্ডি লেক সংলগ্ন রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নাগরিক সেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মশা নিধন কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই গণশুনানির আয়োজন করা হয়। গণশুনানি উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বিজ্ঞাপন
এতে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক, সেতু, রেলপথ ও নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এতে সভাপতি করেন ডিএসসিসি প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।
এসময় নাগরিকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতা, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, জনস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা নিয়ে তাদের মতামত, অভিযোগ ও পরামর্শ তুলে ধরেন।
এই আয়োজনে ডিএসসিসি অঞ্চল-১ এর অন্তর্ভুক্ত ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান ও শাহবাগসহ সংলগ্ন এলাকার নাগরিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন।
স্টাফ-কোয়ার্টারের ডেঙ্গুর দায় গণপূর্তকে নিতে হবে
বিজ্ঞাপন
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন নাগরিক স্টাফ কোয়ার্টারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ নানা অভিযোগ তুলেন। একজন বলেন, স্টাফ কোয়ার্টারে প্রচুর ময়লা যত্রতত্র ফেলে রাখা হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় সেখানে অবহেলা করা হয়। ফলে ডেঙ্গু মশার বিস্তার ঘটছে।
তখন সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, এ বিষয়ে গণপূর্তকে চিঠি দেবেন। যেন গণপূর্ত ইমিডিয়েট এটার একটা কার্যকর উদ্যোগ নেয়।
গণপূর্তের উদ্দেশে আবদুস সালাম বলেন, আপনাদের স্টাফ-কোয়ার্টারের দায়িত্ব নিতে হবে। তা না হলে ডেঙ্গুর দায়-দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে।
ময়লার বিল ১০০ টাকার বেশি নিলে কঠোর ব্যবস্থা
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া এক স্থানীয় বাসিন্দা বাসা-বাড়ি থেকে ময়লার বিল বেশি নেওয়ার অভিযোগ জানান। তিনি বলেন, ময়লার বিল ১০০ টাকা নিতে চায় না। টাকা কম দিতে চাইলে ময়লা না নিয়ে দুর্ভোগ তৈরি করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিতে হয়।
এমন অভিযোগে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, টাকা না দিলেও ময়লা না নিলে তা অমানবিক বিষয়। এমনটা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেব।
ময়লার বিল ১০০ টাকার বেশি নিতে পারবেন না জানিয়ে আবদুস সালাম বলেন, যদি এতে তাদের (ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান) না হয় তাহলে তাদের বলব, আপনারা ছেড়ে দেন। কিন্তু ১০০ টাকার বেশি নিতে পারবেন না।
বাসিন্দাদের উদ্দেশে প্রশাসক আরও বলেন, ১০০ টাকার বেশি নিলে আপনারা জানাবেন। আমরা এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে পদক্ষেপ নেব।
অলিগলিতে হকারদের ময়লা
সবজি বিক্রেতাসহ অন্যান্য হকাররা অলিগলিতে ময়লা ফেলে অপরিষ্কার করছে বলে অভিযোগ করেন একজন। তিনি বলেন, হকাররা ময়লা ফেলে যায় কিন্তু পরিষ্কার করে যায় না।
এ বিষয়ে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, এ ব্যাপারে আপনাদের সচেষ্ট হতে হবে। নাগরিকরা সচেতন ও সচেষ্ট হলে হকাররা ময়লা ফেলে যেতে পারবেন না।
এ ছাড়াও গণশুনানিতে রাতে হর্ন বাজানো, গান-বাজনা, ডিশ/নেট লাইন, ব্যাটারি রিকশাসহ নানা অভিযোগ তুলে ধরেন নাগরিকরা। পাশাপাশি এসব সমস্যা সমাধানের কথা জানান ডিএসসিসি প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করবে এই উদ্যোগ: মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
গণশুনানি উদ্বোধনকালে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, নাগরিকদের সমস্যা সিটি করপোরেশন জানতে চাচ্ছে। এর ফলে সমস্যা সমাধানে উভয় পক্ষের দায়িত্ব বুঝবে। সিটি করপোরেশনের যেমন দায়িত্ব আছে, নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। নগরের সমস্যা সমাধান করার জন্য এটি (গণশুনানি) নাগরিকদের অন্তর্ভুক্ত করার দারুণ উদ্যোগ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই গণশুনানি জনগণের প্রত্যাশা এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সেবার মান বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
মন্ত্রী আরও জানান, ধানমন্ডি লেককে কোনোভাবেই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে ধানমন্ডি এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হকার কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, জনগণ যে পরিবর্তন ও উন্নয়ন দেখতে চায়, সরকার তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নগর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলব: প্রশাসক
প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, শহরের সমস্যা সমাধানে আমাদের ৫০ শতাংশ ও নাগরিকদের ৫০ শতাংশ দায়িত্ব। আমরা নাগরিকদের কথা শুনব। আমাদের কথাও তাদের শুনতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকাকে বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলব।
ধানমন্ডি লেকের উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, লেকটিকে আরও নান্দনিক, পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং এখানে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে না।
সমাপনী বক্তব্যে প্রশাসক আশ্বাস দেন, জনগণের প্রত্যাশা, অভিযোগ ও পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নগর সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। গণশুনানিতে উত্থাপিত বিভিন্ন সমস্যা ও প্রস্তাবনা সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি ও বাস্তবায়ন করা হবে।
ডিএসসিসি জানায়, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য অঞ্চলেও এই ধরনের গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
এএম/এফএ




