বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই একটি যুগ, একটি সংগ্রাম এবং একটি স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক মহান নেতা, যিনি শুধু একজন রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না; তিনি ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, যুদ্ধক্ষেত্রের সাহসী সেনানায়ক, সংকটকালীন সময়ের নেতৃত্বদানকারী একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তক এবং কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে অধিষ্ঠিত।
বিজ্ঞাপন
সেই মহান ব্যক্তি, মহান নেতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আজ ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী।
“কিছু মৃত্যু আছে বালিহাঁসের পালকের মতো হালকা, আর কিছু মৃত্যু আছে থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী”—এই বিখ্যাত উক্তিটির মূল উৎস প্রাচীন চীনা ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক সিমা কিয়ান (Sima Qian)। তিনি লিখেছিলেন—
“মানুষের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী; কারও মৃত্যু থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী, আবার কারও মৃত্যু বালিহাঁসের পালকের চেয়েও হালকা।”
পরে মাও সে তুং (Mao Zedong) তাঁর “Serve the People” বক্তৃতায় এই উক্তিটি জনপ্রিয়ভাবে ব্যবহার করেন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত তেমনই একটি মৃত্যু, যা থাই পাহাড়ের চেয়েও ভারী।
বিজ্ঞাপন
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে যখন পুরো জাতি দিশেহারা, বিভ্রান্ত এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম আক্রমণে বিপর্যস্ত, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সেই কণ্ঠস্বর ছিল বাঙালি জাতির জন্য সাহসের আহ্বান, প্রতিরোধের ডাক। “আমি মেজর জিয়া বলছি…”—এই উচ্চারণ মুক্তিযোদ্ধাদের রণপ্রেরণায় পরিণত হয়েছিল। ইতিহাসের সেই মুহূর্তে তার কণ্ঠে মানুষ খুঁজে পেয়েছিল সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং বিজয়ের প্রত্যয়। শুধু এই একটি কারণেই ইতিহাসের পাতায় জিয়াউর রহমান অজর, অমর, অক্ষয় হয়ে থাকবেন।
যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি তিনি। অস্ত্র হাতে নিয়ে বাঙালি সৈনিকদের সঙ্গে অদম্য সাহস নিয়ে বিশাল পাক সেনাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন তীব্র প্রতিরোধ। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে এবং যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে পূর্ব বাংলাকে ১০টি সেক্টরে ভাগ করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তার নেতৃত্ব ছিল দৃঢ়, কৌশলী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক। সৈনিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করা এই মানুষটি কখনো নিরাপদ দূরত্বে বসে নির্দেশ দেননি; বরং সম্মুখ সারিতে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। এজন্যই মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন এক নির্ভীক সেনাপতি। সেক্টর কমান্ডারদের কাছেও তিনি ছিলেন এক বুদ্ধিদীপ্ত চৌকস কমান্ডার।
কলকাতায় ১২ ও ১৩ জুলাই সেক্টর কমান্ডারদের যে সম্মেলন হয়েছিল, সেখানে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্নেল এম এ জি ওসমানীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির এক পর্যায়ে ওসমানী সাহেব পদত্যাগ করলে বিষয়টি নিয়ে সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে শুরু হয় ব্যাপক কানাঘুষা ও গুঞ্জন। প্রবাসী সরকার ও সর্বাধিনায়কের মধ্যে বিরোধ মীমাংসায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন মেজর জিয়াউর রহমান। ফলে মুক্তিযুদ্ধ সাফল্যের মুখ দেখে ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে বিপন্ন, তখন জিয়াউর রহমান জাতিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখান। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক মুক্তি ও আত্মনির্ভরতা ছাড়া একটি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি কৃষি, শিল্প, শিক্ষা এবং উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুনর্জীবিত করতে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো আজও স্মরণীয়। তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতির মূল উৎস হবে গ্রামের মানুষ।” তার শাসনামলে খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রাণ হচ্ছে কৃষক। কৃষকের মুখে হাসি ফুটলে দেশ এগিয়ে যাবে।
জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ ছিল তার ব্যক্তিগত সততা, স্বচ্ছতা এবং সাদাসিধে জীবনযাপন। স্বজনপ্রীতির বিষাক্ত ছোবল থেকে তিনি ছিলেন যোজন যোজন দূরে। তিনি ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু মনে করতেন না; বরং মনে করতেন পবিত্র দায়িত্ব পালনের আধার হিসেবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি শৃঙ্খলা, কর্মনিষ্ঠা এবং দেশপ্রেমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজভাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে তিনি মানুষের কথা শুনতেন, সমস্যার কথা জানতেন এবং সমাধানের চেষ্টা করতেন। ফলে মানুষ তাকে নিজেদের একজন বলেই মনে করত। তাই সেদিন যখন শহীদ জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, তখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সড়ক, নৌ ও রেলপথে মানুষ এসে শামিল হয়েছিল। তখন ৮ কোটি মানুষের দেশে এমন বিশাল জানাজা ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর একদলীয় শাসনের অন্ধকার থেকে দেশকে বের করে এনে তিনি রাজনৈতিক বহুমতের চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করেন। সংবাদপত্র, রাজনীতি এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি নতুন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেন।
পররাষ্ট্রনীতিতেও জিয়াউর রহমান ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। তিনি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজ করেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তীতে সার্ক (SAARC) প্রতিষ্ঠার পেছনেও তার চিন্তার প্রভাব ছিল বলে অনেকে মনে করেন।
জিয়াউর রহমান ছিলেন জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী প্রবক্তা। তিনি “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণা তুলে ধরে জাতিকে একটি স্বতন্ত্র আত্মপরিচয়ের ভিত দিতে চেয়েছিলেন। তার রাজনৈতিক দর্শনের মূলেই ছিল স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদা রক্ষা। এজন্য দেশের মানুষ তাকে একজন আপসহীন দেশপ্রেমিক হিসেবে মনে রেখেছে।
কিন্তু একজন নেতার প্রকৃত মর্যাদা বোঝা যায় তার মৃত্যুর পর মানুষের প্রতিক্রিয়ায়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশ শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে।
মনে পড়ে যায় গ্রামের সেই বৃদ্ধ কৃষাণীর কথা, যার উঠোনে এক তপ্ত দুপুরে হাজির হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। তাকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, আমার ক্ষুধা লেগেছে, একটা ডিম সিদ্ধ করে দাও। বৃদ্ধ কৃষাণী বলেছিলেন, ডিম তো নেই। তারপর তিনি কলা, পেঁপে, পেয়ারা চাইলেন। কিন্তু কিছুই দিতে পারেননি বৃদ্ধ কৃষাণী। অবশেষে প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেছিলেন, আপনি হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল পালন করবেন। গাছ লাগাবেন। আগামী বছর এসে খাবো। বৃদ্ধ কৃষাণী তার কথা রেখেছিলেন, কিন্তু জিয়াউর রহমান আর কখনো ফিরে যেতে পারেননি।

এভাবেই কৃষকের মনের কথা জানতে, তাদের হাঁড়ির খবর জানতে প্রেসিডেন্ট জিয়া গ্রাম-গঞ্জে মেঠো পথ ধরে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। কখনো ধানক্ষেতের আইল ধরে হাঁটার সময় মিশে গেছেন কৃষকের সঙ্গে।
প্রেসিডেন্ট জিয়া মনে করতেন, “গ্রামের একজন সাধারণ কৃষকের কাছে সবচেয়ে প্রিয় প্রসঙ্গ তার ফসলের মাঠ, হালের গরু, ফলের গাছ, পুকুরের মাছ, খালের পানি, মোটা কাপড় আর গামছা ইত্যাদি। আমি এসবেরই খোঁজ করি। যদি বলেন এটা আমার রাজনীতি, অস্বীকার করব না। আমি যেন এই প্রিয় প্রসঙ্গের রাজনীতি করে যেতে পারি, সেই দোয়া করবেন।”
আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। তার জীবন থেকে মানুষ শিখেছে দেশপ্রেম, সাহস, আত্মত্যাগ এবং কঠোর পরিশ্রমের শিক্ষা।
সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে ঘিরে মানুষের আবেগ কমেনি। কারণ ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যারা কেবল একটি সময়ের নেতা নন—তারা হয়ে ওঠেন জাতির স্মৃতি, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের অংশ। জিয়াউর রহমান তেমনই এক নাম, যাকে ঘিরে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আজও শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গর্বের অনুভূতি জাগ্রত হয়। আর এ কারণেই যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন ইতিহাস-ঐতিহ্য সমুন্নত থাকবে; ততদিন অমর হয়ে থাকবেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান—অজর, অক্ষয় হয়ে থাকবেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে।
লেখক: আমিরুল ইসলাম কাগজী, সাংবাদিক
এআর




