ঈদুল আজহার পরদিনও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, অলিগলি ও ড্রেনে পড়ে আছে কোরবানির পশুর বর্জ্য। কোথাও স্তূপ করে রাখা নাড়িভুঁড়ি, কোথাও রক্তমাখা পানি, আবার কোথাও পশুর চামড়া ও খুর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় নগরজুড়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
গরম আবহাওয়ার কারণে এসব বর্জ্য দ্রুত পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, এতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বিজ্ঞাপন
শুক্রবার (২৯ মে) বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর, রামপুরা, মালিবাগ, শান্তিনগর, মগবাজার, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক জায়গায় এখনো সড়কের পাশে পড়ে আছে কোরবানির বর্জ্য। কোথাও ড্রেনের মুখ আটকে আছে বর্জ্যে, কোথাও আবার জমে থাকা রক্ত ও ময়লা পানিতে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। আবাসিক এলাকার ভেতরের ছোট সড়কগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ দেখা গেছে।
এদিকে কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণে আগেভাগেই সময়সীমা ঘোষণা দিয়েছিল রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম ৮ ঘণ্টার মধ্যে এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ১২ ঘণ্টার আগেই বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দেন। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় পশুর বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সড়কের পাশে জমে থাকা রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও উচ্ছিষ্ট থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে দেখা যায়। কোথাও কোথাও বর্জ্যের স্তূপে মাছি ভনভন করতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচলে যেমন ভোগান্তি তৈরি হয়েছে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা দ্রুত কাজ করলেও সব এলাকায় সমানভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। বিশেষ করে ভেতরের সড়ক ও অলিগলিতে বর্জ্য অপসারণে ধীরগতি দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকায় নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
বিজ্ঞাপন

কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে, নির্ধারিত ডাম্পিং পয়েন্টে বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া হলেও সেগুলো দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে আশপাশে। আবার কিছু এলাকায় বর্জ্য অপসারণের পরও রাস্তায় রয়ে গেছে রক্ত ও ময়লার দাগ। এতে ঈদের আনন্দের মধ্যেও নগরবাসীকে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
মিরপুর এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি অস্বস্তিকর। মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, সকালে বাসা থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। চারদিকে দুর্গন্ধ, সঙ্গে মাছি আর কুকুরের ভিড়। শিশুদের নিয়ে বাসায় থাকা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পরিষ্কার না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
কালশী এলাকার বাসিন্দা রুবিনা হক বলেন, ড্রেনের মুখে বর্জ্য আটকে আছে। এখনই পরিষ্কার না করলে পরে জলাবদ্ধতা তৈরি হবে। গরমে দুর্গন্ধও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। রাস্তার পাশে জমে থাকা বর্জ্যের কারণে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে দুর্গন্ধ বেশি ছড়াচ্ছে।
শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, জানালা খুলে রাখা যাচ্ছে না। দুর্গন্ধে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে, বিশেষ করে ছোট বাচ্চারা বেশি কষ্ট পাচ্ছে।
উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকার বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, মেট্রো স্টেশনের আশপাশে বর্জ্য পড়ে থাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এমন অবস্থা হতাশাজনক। চামড়া ও বর্জ্য একসঙ্গে জমে থাকায় দুর্গন্ধ আরও তীব্র হয়েছে। প্রতি বছর ঈদে এমন অবস্থা হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নেই।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঈদের দিন থেকেই বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করতে দেখা গেলেও একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হওয়ায় পুরো শহর পরিষ্কার করতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অনেক এলাকায় নতুন করে কোরবানি হওয়ায় আবারও বর্জ্য জমছে বলেও জানানো হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বলছেন, এক সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য অপসারণ করতে গিয়ে কিছু এলাকায় দেরি হচ্ছে। তারপরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব বর্জ্য সরিয়ে ফেলার কাজ চলমান রয়েছে।
রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে অপসারণ করতে না পারায় ট্রাকের সংকটকে দায়ী করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, পরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে শহরের সব বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে সরানো সম্ভব হয়নি।
প্রশাসক আব্দুস সালাম জানান, হাটের বর্জ্য সরাতে অবহেলা করলে ইজারাদারদের জরিমানা গুনতে হবে। যে সকল ইজারাদার হাটের বর্জ্য অপসারণের শর্ত মানেননি, তাদের জামানত থেকে বড় অংকের জরিমানা করা হবে। দ্রুতই পুরো শহর পরিচ্ছন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি আরও জানান, ঈদের দ্বিতীয় দিনে বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ হাজার ৭৭৬ টন। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পরিবহন কর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির বর্জ্য দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে তা দ্রুত ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর বিস্তার ঘটায়। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ড্রেনে বর্জ্য জমে থাকলে মশার প্রজননও বৃদ্ধি পায়, যা ডেঙ্গুর ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর ঈদের সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হলেও স্থায়ীভাবে সমাধানের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তারা মনে করছেন, শুধু ঈদের সময় নয়, সারা বছরজুড়ে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শুধু সময়সীমা ঘোষণা দিলেই হবে না, কার্যকর তদারকি ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সফল করা সম্ভব। তাদের মতে, রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগাম প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত জনবল ও দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
এএইচ/এআরএম




