গাবতলী পশুর হাটে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গরুর ডাক, মানুষের হাঁকডাক, দরদাম আর ভিড়ের কোলাহলে মুখরিত থাকে। এর মাঝেও শোনা যায় হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। সেই শব্দের উৎসের কারিগর বাগবাড়ী এলাকার কর্মকার রান্ধন কর্মকার। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গাবতলী হাটের এক কোণে ছোট্ট অস্থায়ী দোকান বসিয়ে ছুরি, চাপাতি, দা ও পশু জবাইয়ের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরি ও শান দেওয়ার কাজে তিনি এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
হাটের প্রবেশমুখ থেকে কিছুটা ভেতরে গেলেই চোখে পড়ে ছোট্ট একটি লোহার চুল্লি, পাশে ছড়ানো-ছিটানো হাতুড়ি, শান দেওয়ার পাথর আর কিছু আধা তৈরি ছুরি। সেখানেই বসে আছেন রান্ধন কর্মকার। মুখে ঘাম, হাতে হাতুড়ি, আর সামনে জ্বলন্ত আগুনে লোহা গরম করে একের পর এক ছুরি-চাপাতি বানিয়ে চলেছেন। চারপাশের বিশৃঙ্খলার মাঝেও তার কাজের ছন্দ একটুও থেমে নেই।
বিজ্ঞাপন
কথা বলতে বলতেই হাতুড়ি থামান না তিনি। গরম লোহায় আঘাত পড়তেই বের হয় টুংটাং শব্দ। সেই শব্দ যেন তার জীবনের ছন্দ। তিনি জানান, ঈদুল আজহা আসলে তার কাজের সময় শুরু হয় প্রকৃত অর্থে। বছরের বাকি সময় কাজ কম থাকলেও এই কয়েকদিনেই পুরো মৌসুমের রুজি-রোজগার হয়ে যায়।
রান্ধন কর্মকার বলেন, সারা বছর অন্য কাজও করি, কিন্তু ঈদের সময় এই কাজই বেশি থাকে। মানুষ গরু কেনার পাশাপাশি ছুরি, চাপাতি, দা এসব তৈরি বা শান করাতে আসে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বসে থাকি। সময় কোথায়, খাওয়ারও ঠিক নেই।
গাবতলী হাটে তার দোকানের আশপাশে গরু-ছাগল কেনাবেচার ভিড় লেগেই আছে। কেউ দড়ি কিনছেন, কেউ গামলা, কেউ আবার সরাসরি গরু দেখে দাম করছেন। সেই ভিড়ের মাঝেই রান্ধন কর্মকারের ছোট্ট জায়গাটি যেন আলাদা এক কর্মযজ্ঞের কেন্দ্র।
তিনি জানান, এ বছর কাঁচামালের দাম বেড়েছে। লোহা ও কয়লার দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। গত বছর যেখানে প্রতি কেজি লোহা ৮০ টাকার মতো ছিল, এবার তা ১১০ থেকে ১২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কয়লার দামও বেড়েছে—আগে এক বস্তা কয়লা ২৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা লাগছে। তবুও কাজ থেমে নেই। বরং চাহিদা বাড়ায় ব্যস্ততা আরও বেড়েছে। দাম কিছুটা বাড়াতে হয়েছে, না হলে খরচ ওঠানো কঠিন। তবে মানুষ প্রয়োজন বুঝে কিনছে বা শান করাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তার তৈরি ছোরা বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, চাপাতি ২৫০ টাকায়, ছুরি ২০০ টাকায়। বড় দা বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়, বঁটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়, আর পশু জবাইয়ের বড় ছুরি ৯০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে শুধু নতুন তৈরি নয়, পুরোনো ছুরি-চাপাতি শান দেওয়ার কাজও সমানভাবে চলছে।
চাপাতি কিনতে আসা মানিক নামের এক ক্রেতা জানান, কোরবানির সময় এসব জিনিস ছাড়া চলে না। গরু কেনার পর জবাই ও কাটার সরঞ্জাম লাগে। তাই এক জায়গা থেকেই সব কিছু পাওয়া গেলে সুবিধা হয়। তিনি বলেন, এখানে এসে নতুন কিনেছি, আবার পুরোনো জিনিস শানও করাচ্ছি।
গাবতলী হাটের চারপাশে ঘুরে দেখা যায়, শুধু পশুর হাট নয়, পুরো এলাকা যেন ঈদকেন্দ্রিক এক অস্থায়ী নগরে পরিণত হয়েছে। কোথাও দড়ি, কোথাও খাটিয়া, কোথাও পশুখাদ্য, আবার কোথাও কর্মকারদের ছোট ছোট দোকান—যেন এক বিশাল কর্মচাঞ্চল্য।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই মৌসুমি কর্মযজ্ঞ শুধু বাণিজ্য নয়, এটি জীবিকারও বড় উৎস। অনেকেই সারা বছর অন্য কাজ করেন, কিন্তু ঈদের সময় এই হাটকে কেন্দ্র করেই তাদের আয় নির্ভর করে।
আফজাল নামের স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রান্ধন কর্মকারকে আমরা অনেক বছর ধরে এখানে দেখি। ঈদ আসলেই তার কাজ শুরু হয়। সারাদিন সেই টুংটাং শব্দ শোনা যায়। অনেকেই গরু কেনার পাশাপাশি এখান থেকেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বানিয়ে নিচ্ছেন বা শান করিয়ে নিচ্ছেন। এতে এক জায়গা থেকেই সব কাজ হয়ে যাচ্ছে।
এএইচ/এআর




