পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীজুড়ে বসতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। ক্রেতা-বিক্রেতার কোলাহল, পশুর ডাক আর ব্যস্ত মানুষের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় অস্থায়ী বাজারগুলো। এরই মধ্যে রাজধানীর হাজারীবাগে বসেছে অন্যতম বড় কোরবানির পশুর হাট, যেখানে প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে। তবে জমজমাট এই হাট ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে ঈদের আমেজ ও বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্যে স্বস্তি, অন্যদিকে যানজট, দুর্গন্ধ ও জনভোগান্তি নিয়ে বাড়ছে অস্বস্তিও।
শনিবার (২৩ মে) সরেজমিনে হাট এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা যায়, হাটের কারণে ঝিগাতলা, ট্যানারি মোড়, হাজারীবাগ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় সবসময়ই যানজট লেগে থাকে। এ যানজটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ে কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ তা মেনেও নিয়েছেন। অন্যদিকে হাটের তত্ত্বাবধানে থাকা ইজারাদারদের প্রতিনিধি বলছেন, নাগরিকদের যাতে কোনো ভোগান্তি সৃষ্টি না হয়, সেজন্য পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হাজারীবাগের স্থায়ী বাসিন্দা কালাম মিয়া। ট্যানারি মোড়ে একটি চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন। গল্প করতে করতে পাশে বসে থাকা একজনকে বলছিলেন, ‘কী যে যানজট শুরু হয়েছে, হাট শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি শেষ হবে না।’ এ সময় ঢাকা মেইলের এ প্রতিবেদকের সঙ্গেও কথা হয় কালাম মিয়ার। তিনি বলেন, প্রতি বছর কোরবানির ঈদে অসহনীয় ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে চলাচলের ক্ষেত্রে। এদিকে রাস্তা ছোট, তার ওপর গরুর হাট, অন্যদিকে জুতার দোকান। সবকিছু মিলিয়ে ঈদের আগের চার-পাঁচ দিন এ এলাকায় যানজট তীব্র রূপ ধারণ করে।
বিজ্ঞাপন
একই দোকানে বসে থাকা আরেক বাসিন্দা জাহিদ হাসান বলেন, যে পরিমাণ পশু এ হাটে আসে, এতে করে পশুর বর্জ্য থেকে সৃষ্ট তীব্র দুর্গন্ধ, সঠিকভাবে বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় দীর্ঘ সময় পড়ে থাকা—এসবের মধ্যে দিয়ে কাজ শেষে বাড়ি ফেরা যে কতটা বিরক্তিকর, তা বলে বোঝানো যাবে না। তবে গতবারের তুলনায় এবার দেরিতে হাট শুরু হওয়ায় তুলনামূলক কম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।
উপরে দুজনের বক্তব্যে অস্বস্তির কথা ফুটে উঠলেও এর বিপরীত চিত্রও তুলে ধরেছেন কয়েকজন এলাকাবাসী। তারা বলছেন, সবকিছুরই ভালো-খারাপ দিক রয়েছে।
রামিম হাসান হাজারীবাগেরই সন্তান। ছোটকাল থেকে বেড়ে ওঠা এখানে। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এ হাটের কারণে আমাদের দূরে যেতে হচ্ছে না। বাড়ির কাছেই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কিনতে পারছি। খরচও কম হচ্ছে। এজন্য এক-দুদিন এসব ভোগান্তি সহ্য করতেই পারি।’
রহিম মিয়া বসবাস করেন ঝিগাতলার গাবতলা মসজিদ এলাকায়। বয়স তার ৬৫ বছর। তিনি বলেন, ‘আগে আমি আমার সন্তানদের এ হাটে পশু কিনতে ও দেখতে নিয়ে যেতাম। ওই সময় এত যানজট হতো না। সময় যত যাচ্ছে, তত এ এলাকায় মানুষের বসবাস বাড়ছে। এ কারণে যানজটসহ অন্যান্য ভোগান্তিও বাড়ছে। তবে আমি চাই হাট এখানে থাকুক। কারণ কোরবানির ঈদে অন্য হাটে যাওয়ার চেয়ে বাড়ির কাছে থেকেই পশু কেনা যায়, নাতি-নাতনিদের নিয়ে হাটে এসে গরু-ছাগল দেখানো যায়। এতে যে আনন্দ রয়েছে, তা বলে বোঝানো যায় না। সুতরাং এমন আনন্দ উপভোগের জন্য এতটুকু সহ্য করা যায়।’
হাজারীবাগ হাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এলাকাবাসী যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেজন্য আমরা দুই হাজার স্বেচ্ছাসেবক রেখেছি। তারা হাট ও সংশ্লিষ্ট আশপাশের সব মোড়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া পুলিশ ও র্যাব প্রতিনিয়ত টহল দিচ্ছে। সিটি করপোরেশন থেকে প্রতি চার ঘণ্টা পরপর ময়লা ও বর্জ্য সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কোথাও বেশি যানজট তৈরি হলে তাৎক্ষণিক সেখানে আমাদের প্রতিনিধি চলে যাচ্ছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে এলাকাবাসীর কোনো সমস্যা না হয়।’
ইতোমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম বলেছেন, ‘কোরবানির বর্জ্য কোনোভাবেই ড্রেন বা নর্দমায় ফেলা যাবে না। এতে একদিকে যেমন রোগ-জীবাণু ছড়াবে, অপরদিকে বৃষ্টি হলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করবে।’ ঈদের দিন দুপুর ১২টা থেকে পরবর্তী ৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম দিনের কোরবানির বর্জ্য সম্পূর্ণ অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে ১১টি পশুর হাট বসছে। হাট ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সচেতনমূলক বার্তাসহ স্বাস্থ্যবিধি, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে ডিএসসিসি।
এমএইচএইচ/জেবি




