ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ ও ‘পেশিশক্তির’ ব্যবহার দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল)।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে ২০২৬ সালের বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আনফ্রেল।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে আনফ্রেলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি, নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস এবং নির্বাচন বিশ্লেষক কার্লো আফ্রিকা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এমএম নাসির উদ্দিন ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন আনফ্রেলের কর্মসূচি বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক থারিন্দু আভেয়রাথনা।
বিগত নির্বাচনে ঋণ খেলাপিদের অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল ইসি। এ ক্ষেত্রে ইসি নিরপেক্ষতা নিয়ে পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে আনফ্রেল নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস বলেন, আমরা বিশ্লেষণ করি, তখন তা সামগ্রিক হওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন খুবই নিরপেক্ষ ছিল এবং আমরা উন্নতি দেখেছি।
এ সময়ে সিইসি ও সচিবের উদ্দেশ্যে ব্রিজা রোজালেস বলেন, যেহেতু নির্বাচন কমিশনের সদস্য এখানে আছে, আশা করি তারা সরাসরি এর সমাধান করবেন।
আরেক প্রশ্নের জবাবে ব্রিজা রোজালেস বলেন, হ্যাঁ, কিন্তু কোনো ঋণগ্রস্থকে সুযোগ দিয়েছে, আবার কাউকে দেয়নি, তা আমরা দেখিনি বা পর্যবেক্ষণ করিনি। তবে আমরা চ্যালেঞ্জটি স্বীকার করি।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি বলেন, আমি বলছি না নির্বাচন শতভাগ ত্রুটিমুক্ত হয়েছে। নির্বাচন আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দীর্ঘ সময় পর ইসি একটি ভালো নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এ কারণেই আমি বলেছিলাম যে আগামী নির্বাচন আমাদের জন্য আরেকটি পরীক্ষা হবে। কিন্তু গতকাল (বুধবার) নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করে আমরা বুঝতে পারলাম যে, তাদের একটি পরিকল্পনা আছে।
পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান বলেন, তারা যা করেছে তা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, এমনকি আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও তারা যে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হোক না কেন। আমার মনে হয়, তারা প্রস্তুত। নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের যথেষ্ট আশা আছে।
আনফ্রেলের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, নির্বাচনের স্থায়ী সংকট হচ্ছে জবাবদিহিতা। নির্বাচনি অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আস্থা সীমিত ছিল, বিশেষত অর্থের প্রভাব ও নির্বাচনি অর্থায়নের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রচারের সঙ্গে উচ্চ নির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন, আর আইন প্রয়োগব্যবস্থাকে প্রায়শই অসম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাস্তব বলে মনে করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নাগরিক সমাজের অনুসন্ধানেও প্রার্থীদের অতিরিক্ত ব্যয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার মধ্যে কিছু ব্যয় নির্বাচনি প্রচারকাল শেষ হওয়ার আগেই সংঘটিত হয়েছে বলে মূল্যায়ন করা হয়। পোস্টার সংক্রান্ত বিধিগুলো দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও তার প্রয়োগে ছিল স্পষ্ট অসামঞ্জস্য, যা কমিশনের নিজস্ব বিধি-বিধান কার্যকর করার ক্ষমতা নিয়ে জনমনে আস্থা হ্রাস করেছে।
নির্বাচন দিনেই অর্থের প্রভাবসংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে আনফ্রেল, যা অন্যথায় সুশৃঙ্খল ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ভোটারের হাতে রাজনৈতিক দলের দেওয়া ভোটার স্লিপ নিয়ে ভোটকক্ষে সামনে পোলিং এজেন্টদের সামনে প্রদর্শন করার বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে আনফ্রেল বলেছে, এটি ভোট কেনাবেচা বা প্রলোভনমূলক চুক্তির একটি যাচাইকরণ পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
নির্বাচনপূর্ব ও প্রচারের সময় ভয়ভীতি ও সহিংসতার পরিবেশ ছিল উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ ও ‘পেশিশক্তি’ ব্যবহার দেখা গেছে। আনফ্রেলের পরিদর্শন করা ভোটদান ও গণনার কেন্দ্রগুলো সাধারণত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং অংশীজনদের উপস্থিতি ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তবে, গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা সর্বত্র সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। ভোট গণনার সময়, কোনো কোনো স্থানে ব্যালট বাক্স খোলার সময় মূল যাচাইকরণ পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা একইভাবে কার্যকর ছিল না। এটি ভোটের ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছে বলে প্রমাণ করে না, তবে এটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে আস্থা হ্রাস করার ঝুঁকি তৈরি করে। ভবিষ্যতে বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে আনফ্রেল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তথ্য প্রবাহের পরিবেশ অত্যন্ত সক্রিয় ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা ও বর্ণনাগত প্রতিযোগিতার একটি মূল ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে। নাগরিক তথ্য ও বিষয়ভিত্তিক বার্তা সংক্রান্ত গণতান্ত্রিক বিষয়বস্তু সাধারণত কারসাজি, ভীতি প্রদর্শন ও বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ সংক্রান্ত অগণতান্ত্রিক বিষয়বস্তু তুলনায় বেশি ছিল। পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র ভোটের অল্প কিছুদিন আগে দেওয়ার কথা জানিয়ে তাতে বলা হয়, যার ফলে ভোটার নিবন্ধন, প্রচার ও বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গণভোটের ফলাফল জুলাই সনদের অধীনে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য অগ্রগতির প্রত্যাশা জোরদার করে বলেও মনে করে সংস্থাটি।
আনফ্রেলের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচন দিনের আস্থার ইতিবাচক অগ্রগতি তখনই টেকসই হবে, যদি নির্বাচন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা রূপান্তরমূলক বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হয়, যা নিয়মভিত্তিক জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নির্বাচনি অর্থ ব্যয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগ করার স্পষ্ট সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, ভয়ভীতি দেখানো ও বারবার রাজনৈতিক সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধ করতে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ।
এমএইচএইচ/ক.ম




