শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ঢাকা

টেন্ডার ছাড়া জরুরি তেল আমদানি চেষ্টার কী হলো?

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২৬, ০১:১২ পিএম

শেয়ার করুন:

টেন্ডার ছাড়া জরুরি তেল আমদানি চেষ্টার কী হলো?
টেন্ডার ছাড়া জরুরি তেল আমদানি চেষ্টার কী হলো?

জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলা ও জরুরি ভিত্তিতে মজুত বাড়াতে সরকার প্রথাগত দরপত্র প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১২টি বিদেশি কোম্পানিকে তেল সরবরাহের অনুমতি দিয়েছিল। তবে কার্যাদেশ পাওয়ার পরও মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনও কোম্পানিই তেল সরবরাহ করতে পারেনি বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা যায়, কার্যাদেশ পাওয়া কোম্পানিগুলোর অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই, নেদারল্যান্ডস, হংকং, কাজাখস্তান, মালয়েশিয়া ও জাপানে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল, অকটেন ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির পরিকল্পনা ছিল সরকারের।


বিজ্ঞাপন


তবে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অনুমোদন পেলেও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এখনও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেনি। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, কার্যাদেশ পাওয়া ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র দুটি কোম্পানি পারফরম্যান্স গ্যারান্টি বা জামানত জমা দিয়েছে। আরও একটি প্রতিষ্ঠান জামানত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধকে ঘিরে মার্চ মাসে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি হলে দেশে তেলের সরবরাহ ও মজুত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। সেই পরিস্থিতিতে দ্রুত তেল আমদানির লক্ষ্যেই দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির উদ্যোগ নেয় সরকার।

জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, যুদ্ধের কারণে সংকট সমাধানে সরকার এই উদ্যোগ নেয়। মানুষ যাতে আতঙ্কিত হয়ে তেল কিনে সংকট সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য মজুত বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে তেল আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়।

Tuku
জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ

তিনি বলেন, আমার জিটুজি ছিল কাতারের সাথে তারাতো ফোর্স মেজর দিয়ে বসে গেছে। সৌদি আরব বসে গেছে। আমাকে তো আনতে হচ্ছে অন্য জায়গা থেকে তেলগুলো। যখন যেটা প্রয়োজন হবে ন্যাচারালি আমাদের স্পটে যেতে হবে। আমরা জানি যে, কয়টা আসবে না বা আসবে, সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ফেয়ার একটা চান্স সবাইকে দিচ্ছি। তারমধ্যে যে কয়টা আসবে, সে কয়টাতে আমাদের তেলের মজুত বাড়বে।

মার্চ মাসে তেল সংকটের সময় বিপিসির কাছে অর্ধশতাধিক কোম্পানি তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে কার্যাদেশ পাওয়া কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবে তেলের দরে পার্থক্য রয়েছে। যেমন ডিজেল সরবরাহে দুবাই ভিত্তিক পেট্রোগ্যাসের প্রস্তাব ছিল ব্যারেলপ্রতি ১৭৫ ডলার, নেদারল্যান্ড ভিত্তিক এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের প্রস্তাব ২২১ ডলার।

আবার এঅ্যান্ডএ এনার্জি নামে মার্কিন একটি কোম্পানি মাত্র ৭৫ ডলারে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়ে অনুমোদন পায়। সংকটকালে বিশ্ববাজারে তেলের দর বিবেচনায় এই দর প্রস্তাব ছিল অস্বাভাবিক।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, যাচাই-বাছাই করেই প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। তারপরে আপনারা বলবেন যে, এত কম দাম ছিল, সেটা গ্রহণ না করে বেশি দামেরটা গ্রহণ করা হচ্ছে। সেজন্য কম দামও গ্রহণ করলাম কিন্তু পিজি দিতে পারছে না। ন্যাচারালি আমাদের সবদিকে রক্ষা করতে হয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিপিসি জানায়, যে দামে প্রস্তাব পাস হয়েছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কারণ তেল সরবরাহ দিতে পারলে মূল্য নির্ধারণ হবে বিধিবদ্ধ ফর্মুলায়।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, এটা হলো টেনটেটিভ প্রাইস। মূল হলো যখন তারা সাপ্লাইটা দেবে, তখন যে ভ্যালুয়েশনটা হবে। অর্থাৎ যেদিন লোডিংটা হবে সেই লোডিং ডেটের দুইদিন আগে এবং দুইদিন পরে এই পাঁচদিনের প্ল্যাটস রেটের (প্ল্যাটস আরব গালফ) এই পাঁচদিনের যে দর, তার গড় যেটা সেটাই হবে মূল প্রাইস।

Oil1
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে তেল সংকট তৈরি হয়

ডিপিএম পদ্ধতিতে আমদানির উদ্যোগ নিয়ে বিপিসির চেয়ারম্যান বলেন, যুদ্ধের মূল সময়টা বলা যায় মার্চে আমাদের একটু অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। তখন ১৭টা পার্সেল ছিল তার মধ্যে সাতটা পার্সেল ডেফারড হয়। সেই সাতটা পার্সেল আমরা এপ্রিল এবং মে মাসে কনফার্ম করেছি।

তিনি আরও বলেন, মার্চে সংকট শুরুর পর যেহেতু আমাদের বেশ কিছু কার্গো ডেফার করা হয়েছিল এবং ফোর্স মেজর ঘোষণা করা হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে আমরা সোর্স ডাইভারসিফিকেশনে হাত দিয়েছিলাম। তারই পার্ট হিসেবে আমরা কিছু সময়ের জন্য ডিপিএমএর একটা উদ্যোগ নিয়েছি। যেটা অলরেডি ক্লোজ হয়েছে।

রেজানুর রহমান বলেন, আমাদের কিছু স্টকের ব্যাপার আছে। মূলত ডিপিএম এর একটা বিষয় ছিল আমরা সোর্সগুলোকে আইডেন্টিফাই করতে চেয়েছিলাম। সেটা আমাদের মোটামুটি আইডেন্টিফাই হয়েছে। বিভিন্ন সোর্স আমাদের কাছে এসেছে যে এখান থেকে ফুয়েল সাপ্লাই তারা দিতে পারে। আর দ্বিতীয় হলো আমরা চেয়েছিলাম যদি আমরা কোনো কারণে সাপ্লাই চেইন বড় রকমের ডিসরাপশন হয়, সেটা যেন আমরা ডিপিএম দিয়ে কাভার দিতে পারি।

এখন তিন মাসের জন্য নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান বিপিসি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, মিনিস্ট্রি থেকে বলা হয়েছে আমরা যাতে নব্বই দিনের মজুত নিশ্চিত করি। এগুলো বিবেচনাতে আমরা শর্ট একটা পারচেজে গিয়েছি। জুন জুলাই আগস্ট এ তিনমাসকে টার্গেট করে এই টেন্ডার করেছি। এটা এডিশনাল। ওপেন টেন্ডার প্রক্রিয়ায়। আমরা এখন আর ডিপিএম এ যাচ্ছি না।

তেল আমদানির পদ্ধতি

বাংলাদেশে নিয়মিত তেল আমদানি হয় দুটি পদ্ধতিতে। জিটুজি প্রক্রিয়ায় সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে অর্ধেক। আর বাকি অর্ধেক আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে যা ওটিএম নামে পরিচিত। বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দরপত্র ছাড়া ডিপিএম বা ডিরেক্ট পারচেজ মেথড ব্যবহৃত হয়। প্রতি বছর জানুয়ারি থেকে জুন এবং জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই দুই ধাপে সারা বছরের জন্য চাহিদা নিরূপণ করে জ্বালানি তেল আমদানি নিশ্চিত করে বিপিসি।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানান, সরকার নব্বই দিনের মজুত নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দিয়েছে যার প্রেক্ষিতেই জরুরি ভিত্তিতে ডিপিএম পদ্ধতিতে সরাসরি কার্যাদেশ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ডিপিএম পদ্ধতির ১২টি কোম্পানির মধ্যে তিনটি কোম্পানি যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলেও জানান বিপিসির চেয়ারম্যান।

9
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান

তিনি বলেন, ইকনমিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি ও পারচেজ কমিটি অনুমোদনের পর আমরা নোয়া (নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড) দেই। নোয়া দেওয়ার পর তারা আমাদেরকে পিজি দেয়। পিজি দিলে আমরা এলসি খুলি। এলসি খুললে তারা পণ্যটা সরবরাহ করে।

ডিপিএম পদ্ধতিতে অনুমোদন পাওয়া কোম্পানিগুলোর বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, দুটি কোম্পানি পিজি দিয়েছে। একটা কোম্পানি পিজি দেবে বলে এই মর্মে জানিয়েছে। এই তিনটা কোম্পানি এ পর্যন্ত আমাদের কাছে রেসপন্স করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে কম রেট পাওয়াতে রেসপন্স করেছি। এখন টাইম বাউন্ড হওয়ার কারণে এর মধ্যে চারটা কোম্পানি ডিকলাইন করেছে। একটা মেয়াদ পার হয়েছে। একটা বলেছে পিজি দেব না। আর দুটো বলেছে আমরা সাপ্লাই দেব না। আর চারটা কোম্পানির সময় আছে।

বিপিসি চেয়ারম্যান বলছেন, আমরা সময় কম পেয়েছি। আমাদের পর্যায়ে যতটুকু যাচাই-বাছাই প্রয়োজন ছিল আমরা ওইটুকু করেছি। কোম্পানি এবং তার ভলিউম এবং তার সক্ষমতা এটা আমরা দেখেছি।

তিনি আরও বলেন, এটাতো আসলে স্বাভাবিক সময়ের জন্য না। আমরা যদি এটা না করতাম যদি কোনো কারণে সাপ্লাই চেইন ফেইল করতো তাহলে আপনারা বা কেউ আমাদেরকে ছাড়তেন না এবং প্রশ্ন করতেন যে আপনারা কেন ভিন্ন সোর্স খোঁজেন নাই ভিন্ন সোর্সে আনার উদ্যোগ নেননি। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতাম না। আমরা যেটুকু সফল হই ওটাতো একটা সাকসেস। তার চেয়ে বড় কথা যে আমরা অনেকগুলো সোর্স জানতে পারলাম যে বিভিন্ন সোর্সে তেল সাপ্লাই হচ্ছে বিভিন্ন জায়গাতে।

এদিকে দরপত্র ছাড়া সরবরাহের কার্যাদেশ পাওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে মধ্যম সারির সাপ্লাইয়ার যেমন আছে তেমনি ট্রেডার ও মধ্যস্থতাকারী কোম্পানিও রয়েছে বলে ধারণা পাওয়া যায়। এসব কোম্পানিকে কার্যাদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ে খুবই কম সময় নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে এমনও কোম্পানি আছে যেটি প্রস্তাব করার এক সপ্তাহের মধ্যেই কার্যাদেশ পেয়েছে।

10
ড. ইফতেখারুজ্জামান

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জরুরি অবস্থায় সরাসরি ক্রয় সরকার করতে পারে। সরকার যদি মনে করে যে, পরিস্থিতি এরকম এটি বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে যথাযথ প্রক্রিয়ার বাইরে ডাইরেক্ট পারচেজ মেথডে যাওয়া, সেক্ষেত্রে সেটা করতেই পারে।

তিনি বলেন, যে কারণে এক্স বা ওয়াই কোম্পানিগুলোকে বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচন করা হয়েছে, দায়িত্বটা দেওয়া হলো সেটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছে কিনা এবং তাদের সে যথাযথ ক্রেডিবিলিটি আছে কিনা এবং তার কাছ থেকে আমরা যে অঙ্গীকারটা পেলাম- সেটা ডেলিভারি করার মতো সক্ষমতা আছে কিনা, এই জিনিসগুলো নিশ্চিত করাটা হলো অপরিহার্য। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় হয়ে থাকলে প্রশ্ন ওঠে যে এটা বিশেষ কোনো সুবিধার জন্য হয়েছে কিনা।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা মানতেই হবে একটা বিশাল ক্রাইসিস। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস। যার মধ্যে সরকারের কোনো এখতিয়ার ছিল না। কোনো প্রতিরোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। অনেকটা জরুরি অবস্থার মতোই ছিল। কাজেই একটা বাধ্যবাধকতা ছিল।

এরকম দুর্যোগকালীন সময়ে এই এখতিয়ারটুকু সরকারের আছে যে প্রয়োজনে যথাযথ যুক্তি সাপেক্ষে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা বাইপাস করে করতে পারে, যাতে করে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে বা ঘটারই প্রত্যাশা ছিল।

তিনি আরও বলেন, একটা হচ্ছে কিছু সংস্থা সরবরাহ করতে পারেনি, সময় অনুযায়ী এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা মনে করি যেহেতু সরকারের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ছিল সকল প্রকার ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা- কাজেই এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়াটা আমরা অপরিহার্য বলে আমরা মনে করি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর